Category Archives: রমযান প্রসঙ্গ !

Gallery

সিয়াম, রামাদান ও কুরআন

সিয়াম ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই প্রবন্ধে আমরা সিয়াম ও রামাদান সম্পর্কে আলোচনা করব, ইনশা আল­াহ। প্রভাত (সুবহে সাদেক) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত আল্লাহরা এবাদত ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার, দাম্পত্য মিলন ইত্যাদি সকল সিয়াম বা রোযা ভঙ্গকারী কর্ম থেকে বিরত … Continue reading

Gallery

সিয়াম, ইফতার, পানাহার ও মেহমান সম্পর্কিত কিছু দু‘আ

(১) চাঁদ দেখার দুআ: আমরা সাধারনত রমাদান ও শাওয়ালের চাঁদ দেথে থাকি। মুসলমান হিসেবে চাঁদ দেখে প্রতি আরবী মাসের হিসাব রাখা আমাদের কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ  হেলাল বা নতুন চাঁদ দেখলে নি¤েœর দু‘আ টি বলতেন। রমযান ও সকল মাসের নতুন চাঁদ … Continue reading

Gallery

আহকামে সিয়াম

This gallery contains 1 photos.

রামাদানের সিয়াম ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত। এই প্রবন্ধে আমরা সিয়ামের বিধান নিয়ে আলোচনা করব। আল্লাহর কত দয়া! ইসলামকে কত সহজ করেছেন। সাহরী খাওয়া আমাদের নিজেদের জন্যই প্রয়োজন, অথচ আল্লাহ এ কাজটিকে ইবাদত বানিয়ে দিয়েছেন। খেলে আল্লাহ খুশি হন এবং সাওয়াব … Continue reading

Gallery

রামাদান ও তারাবীহ

তারবীহরামাদান ও তারাবীহ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর অধ্যাপক, আল-হাদীস বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট পিডিএফ ডা্উনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন http://assunnahtrust.com/wps/wp-content/uploads/2015/06/%D8%A7%D9%84%D8%AA%D8%B1%D8%A7%D9%88%D9%8A%D8%AD1.pdf ১. কিয়ামুল্লাইল ও তাহাজ্জুদ তারাবীহ (التراويح) বহুবচন, একবচন তারবীহাহ (الترويحة)। এর অর্থ প্রশান্তি, আরাম, বিনোদন, শিথিলায়ন, শিথিল হয়ে … Continue reading

বিদায় রমযান, বিদায় ঈদ ।

রমযান মাস পুরোটাই কল্যাণ ও বরকতের মাস; এই মাস মেঘমালার মতো আল্লাহর বান্দাদেরকে শীতল ছায়া দান করছিল; মেহরাবগুলোতে হাফেয সাহেবদের সুমধুর তেলাওয়াত, যা মূলত মুমিনের উদ্দেশ্যে রাহমানুর রাহীমের আহবান, হৃদয় ও মস্তিষ্কে আলো দান করছিল; যিকির ও দুআ এবং তেলাওয়াত ও তাহাজ্জুদ, অন্তরকে আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতিতে সিক্ত করছিল এবং চোখ থেকে খোদাভীতির অশ্রু ঝরাচ্ছিল।index

দেখতে দেখতেই এই ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটল; যেন ইবাদতের এই বিশেষ রোখ পরিবর্তিত হল এবং পয়লা শাওয়ালে রোযার পরিবর্তে ইসলামী শিক্ষা মোতাবেক ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নির্দেশ এল এবং এরই মাধ্যমে বান্দা তার পরিচয় তুলে ধরার নির্দেশ পেল।

শাওয়ালের ২ তারিখ থেকে এক বছরের জন্যে এই দুই নেয়ামত রমযান ও ঈদ আমাদের নিকট থেকে বিদায় নিল। যদি হায়াত পাই আর আল্লাহ তাআলার তাওফীক নসীব হয় তাহলে পুরো এক বছর পর আবার এই দুই নেয়ামত আমরা ফিরে পাব।

এ পর্যায়ে একজন মুমিনের ভেবে দেখা উচিত, রমযান ও ঈদ থেকে তিনি কী আহরণ করলেন এবং এর কী প্রভাব তার হৃদয় ও মস্তিস্কে, বোধ ও বিশ্বাসে এবং কর্ম ও চরিত্রে অবশিষ্ট রইল। রমযান থেকে তিনি কী পেলেন এবং রমযানের বিদায়ে কী খায়ের-বরকত হারালেন।

এটা বাস্তব সত্য যে, রমযানের হক যিনি যত বেশি আদায় করেছেন, রমযানের আদবসমূহের প্রন্তুি যিনি যত বেশি যত্নবান থেকেছেন তিনি তার কর্মজীবনে রমযান ও ঈদের প্রভাব তত বেশি অনুভব করবেন। পক্ষান্তরে যিনি যেমন ত্রুটি করেছেন ত্রুটির মাত্রানুপাতে প্রভাব ও ক্রিয়াতেও ত্রুটি উপলব্ধি করবেন।

আমরা যদি রোযা ও রমযানের পুরা হক আদায় করে থাকি তাহলে রমযানের সবচেয়ে বড় প্রভাব (যদি রোযা রাখা হয়ে থাকে এবং রোযাকে গুনাহমুক্ত রাখা হয়ে থাকে) তাকওয়া; যা বান্দাকে প্রতি মুহূর্তে পথনির্দেশ দান করে; বান্দাকে কল্যাণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং অকল্যাণের প্রতি বিরূপ করে। তাকওয়াপূর্ণ অন্তর নসীহত দ্বারা দ্রুত প্রভাবিত হয় এবং সামান্য সতর্ক করার দ্বারা অমঙ্গলের পথ থেকে ফিরে আসে।

আর যদি রমযানের পুরা হক আদায় না করে থাকি তাহলে তাকওয়ার সেই বিশেষ স্তর আমাদের অর্জিত হয়নি। তবুও নিরাশ হওয়ার কিছুই নেই। কেননা প্রতিটি মুমিনের অন্তরে সামান্য পরিমাণে হলেও তাকওয়ার স্ফুলিঙ্গ অবশ্যই থাকে; আর রোযার মাধ্যমে তাতে কিছু না কিছু বৃদ্ধি অবশ্যই ঘটে থাকে। এখন যদি তা লালন করা যায় এবং সে মোতাবেক ধীরে ধীরে আমল করা যায় তাহলে এই বৈশিষ্ট্য দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর এবং উজ্ঝল থেকে উজ্ঝলতর হতে থাকবে। গুণাবলি ও যোগ্যতাসমূহের এটাই সহজাত নিয়ম। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিকারী সৎগুণাবলির বিষয়ে এ কথা আরো বেশি সত্য।

আল্লাহ তাআলা হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেছেন, ‘‘বান্দা আমার প্রতি যেরূপ ধারণা রাখে আমি তার সাথে সেরূপ আচরণ করি এবং বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে আমি তার সঙ্গী হই। যদি সে আমাকে একাকী স্মরণ করে আমিও তাকে একাকী স্মরণ করি। যদি সে আমাকে জামাতে সমবেতভাবে স্মরণ করে আমিও তাকে তাদের চেয়ে উত্তম জামাতে স্মরণ করি। যদি বান্দা আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয় আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয় আমি তার দিকে চার হাত অগ্রসর হই। আর যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’’-সহীহ মুসলিম ২/৩৪১

এখন যদি অন্তরে কোনো নেক কাজের আগ্রহ সৃষ্টি হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি তাকওয়া ও খোদাভীতির প্রভাব; এর কদর করতে হবে এবং বিলম্ব না করে এই আগ্রহ অনুযায়ী আমল করতে হবে। তেমনি কোনো গুনাহের বিষয়ে, যাতে আমরা দুর্ভাগ্যবশত লিপ্ত রয়েছি, অন্তরে যদি ঘৃণা সৃষ্টি হয় এবং তা পরিহার করার তাগাদা উপলব্ধি হয় তাহলে বুঝতে হবে এটা সেই অন্তনির্হিত তাকওয়া ও খোদাভীতির প্রভাব। এর কদর করা এবং সাথে সাথেই সে গুনাহ পরিত্যাগ করে খাঁটি মনে তওবা করে নেওয়া জরুরি। এব্যাপারে বিলম্ব করা এজন্যেও ভয়াবহ যে, দুর্বল তাকওয়ার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং বার বার অন্তরের এরূপ আগ্রহকে অবহেলা করলে তা আরো দুর্বল হয়ে যায়; যা একজন মুমিনের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়।

মোটকথা তাকওয়ার গুণ যার যতটুকু অর্জিত হয়েছে তা সংরক্ষণ করা এবং সযত্ন পরিচর্যার মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করাই হবে রমযানের নেয়ামতের যথার্থ শোকর আদায়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন, আমীন।

আল্লাহর যেসব বান্দা রমযানের রোযাও রাখেনি এবং ঈদও পালন করেছে ভিনজাতির মতই অনুষ্ঠান-সর্বস্বরূপে; এবং রমযানের শেষ দশক-যা পুরো মাসের রূহ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ সময়, একেও যারা ঈদ-মার্কেটের পেছনে নষ্ট করেছে; তাদের কাছে রমযান এবং ঈদের চিহ্ন যদি কিছু থাকে তাহলে আছে নতুন ডিজাইনের পোশাক আর জুতো এবং বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে পাওয়া কিছু গিফ্ট আর ঈদ কার্ড !!

তেমনি যারা রমযানে জিনিসপত্রের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রোযাদারদের থেকে অন্যায়ভাবে অধিক মুনাফা লুটে সম্পদের পাহাড় গড়েছে অথবা বিতাড়িত শয়তানের শৃঙ্খখলিত হওয়া সত্ত্বেও যারা এই মুবারক মাসে অন্যায়-অপরাধে ও দুর্নীতি-সন্ত্রাসে লিপ্ত ছিল- এদের সবার জন্যে এখনও পথ খোলা রয়েছে; আল্লাহ রাববুল আলামীন অসীম দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর দয়ার দুয়ার সব বান্দার জন্য খোলা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্মোক্ত বাণী একটু হৃদয় দিয়ে শুনুন-

ان الله عز وجل يبسط يده بالليل ليتوب مسيئ النهار ويبسط يده بالنهار ليتوب مسيئ الليل حتى تطلع الشمس من مغربها.

‘‘আল্লাহ তাআলা রাতে তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন (বান্দার তওবা কবুল করার জন্যে উন্মুক্ত থাকেন) যাতে দিনের অপরাধী তওবা করে (কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে) এবং আল্লাহ দিনে তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন যাতে রাতের অপরাধী তওবা করে; যত দিন না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়। (কেয়ামতের আগ পর্যন্ত এ সুযোগ অবারিত)।’’-সহীহ মুসলিম ২/৩৫৮

তাই বিলম্ব না করে এই সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করা উচিত; খাঁটি মনে তওবা করে কল্যাণের দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত এবং আগামী রমযানের কল্যাণ ও বরকত লাভের জন্যে নিজেকে প্রস্ত্তত করা উচিত।

এ বিষয়ে শেষ কথা এই যে, রমযান মাসে আমরা যেমন আল্লাহর বান্দা ছিলাম এখনও আল্লাহর বান্দা। তাই তখন যেমন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দিতাম, নামাযের দিকে খেয়াল রাখতাম, জামাতের সাথে নামায আদায়ের চেষ্টা করতাম তা এখনও অব্যাহত রাখা উচিত।

গুনাহ যখনই করা হোক তা গুনাহ। তাই রমযান মাস চলে গেলে গুনাহর কাজে লিপ্ত হওয়া যায়-এই চিন্তা

পরিহার করতে হবে। আর নামায তো রোযার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ফরয এবং প্রতিদিনের আমল। ঈমান ও ইসলামের নিদর্শন। যে মুমিন অন্তত এটুকু চিন্তা করবে যে, নামাযের মাধ্যমে মাটির মানুষ তার খালিক ও মালিকের দরবারে হাজিরা দিতে পারছে, তার প্রিয় রহমান ও রহীমের সঙ্গে কথোপকথনে সক্ষম হচ্ছে, তার তো নামাযের বিষয়ে শিথিলতা করা সম্ভব হবে না; বরং অতি দুর্লভ অথচ সহজপ্রাপ্তি ভেবে মনেপ্রাণে নামাযের বিষয়ে যত্নবান হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই সত্য উপলব্ধি করার তাওফীক দান করুন নামাযের গুরুত্ব বোঝার এবং একে জানদার বানানোর চেষ্টায় আমাদেরকে নিয়োজিত রাখুন, আমীন।

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে রোযার গুরুত্ব ও ফযীলত ।

রমযনের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমান, নামায ও যাকাতের পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি শব্দ সওম, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়-প্রত্যেক সজ্ঞান, বালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

(তরজমা) হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।-সূরা বাকারা (২) : ১৮৩

অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন-

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

(তরজমা) সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।- সূরা বাকারা (২) : ১৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فافطروا، فإن غم عليكم فصوموا ثلاثين،

وفي رواية : صوموا لرؤيته وأفطروا لرويته، فإن عم عليكم فاكملوا العدد.

যখন তোমরা (রমযানের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন (শাওয়ালের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৯০৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১০৮০ (১৭-১৮)

উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস এবং এ বিষয়ক অন্যান্য দলীলের আলোকে প্রমাণিত যে, রমযান মাসের রোযা রাখা ফরয, ইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোযা পালন করা ও বিশ্বাস করাও ফরয।

তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমযান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী ও জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী ও ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদীস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী ও ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আবু উমামা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

بينما أنا نائم أتاني رجلان فأخذا بضبعي فأتيابي جبلا وعرا فقالا : اصعد؛ فقلت : إني لا أطيقه. فقالا: سنسهله لك، فصعدت حتى إذا كنت في سواء الجبل إذا بأصوات شديدة، قلت : ما هذه الأصوات؟ قالوا هذا عواء أهل النار، ثم انطلق بي، فإذا أنا بقوم معلقين بعراقيبهم، مشققة اشداقهم، تسيل اشداقهم دما. قال : قلت : من هؤلاء : قال : الذين يفطرون قبل تحلة صومهم.

رواه الحاكم فى المستدرك وقال : صحيح على شرط مسلم، ووافقه الذهبي، وذكره الهيثمى فى المجمع (240)، وقال : رجاله رجال الصحيح

আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এল। তারপর আমাকে বলল, আপনি পাহাড়ের উপর উঠুন। আমি বললাম, আমি তো উঠতে পারব না। তারা বলল, আমরা আপনাকে সহজ করে দিব। আমি উপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছালাম, হঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এ সব কিসের আওয়াজ? তারা বলল, এটা জাহান্নামীদের আর্তনাদ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলাম, যাদেরকে তাদের পায়ের মাংসপেশী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এবং তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললাম, এরা কারা? তারা বলল, যারা ইফতারের সময় হওয়ার আগেই রোযা ভেঙ্গে ফেলে।-সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ১৯৮৬; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৭৪৪৮; সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদীস : ৩২৮৬; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস-১৬০৯; তবারানী, হাদীস : ৭৬৬৬

রমযান মাসের একদিন রোযা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না, ঐ রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখলেও রমযানের এক রোযার যে মর্যাদা ও কল্যাণ, যে অনন্ত রহমত ও খায়ের-বরকত তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন,

من افطر يوما من رمضان متعمدا من غير سفر ولا مرض لم يقضه ابدا، وان صام الدهر كله، … وقد ذكره البخاري تعليقا بصيغة الجزم حيث قال : وبه قال ابن مسعود، وقال الشيخ محمد عوامه : وهذا الحديث موقوف لفظا ومرفوع حكما

যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করে, সে আজীবন রোযা রাখলেও ঐ রোযার হক আদায় হবে না।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮৯৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস : ৭৪৭৬; সহীহ বুখারী ৪/১৬০

হযরত আলী রা. বলেন-

من افطر يوما من رضمان متعمدا لم يقضه أبدا طول الدهر.

যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবে, সে আজীবন সেই রোযার (ক্ষতিপূরণ) আদায় করতে পারবে না।- মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮৭৮

হাদীস শরীফে বর্ণিত রোযার কিছু ফযীলত ও বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো :

১. রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন

প্রত্যেক নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এক অনন্য ঘোষণা।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف، قال الله تعالى : الا الصوم فإنه لى وانا أجزى به يدع شهوته وطعامه من أجلى.

মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৫১ (১৬৪); মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৯৭১৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৮৯৮৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৬৩৮

অন্য বর্ণনায় আছে-

عن أبى هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قال الله : يترك طعامه وشرابه وشهوته من أجلى، الصيام لى وانا اجزى به، والحسنة بعشر امثالها.

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন, বান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার ও কামাচার বর্জন করে, রোযা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দিব আর (অন্যান্য) নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৮৯৪; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৯৯৯৯; মুয়াত্তা মালেক ১/৩১০

রোযা বিষয়ে-অন্য বর্ণনায়-আললাহ তাআলা বলেন, ‘‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। (সহীহ বুখারী হাদীস-১৯০৪)

এ কথার তাৎপর্য হল, যদিও প্রকৃতপক্ষে সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্য, তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তবুও রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। তা হল-অন্যান্য সকল ইবাদতের কাঠামোগত ক্রিয়াকলাপ, আকার-আকৃতি ও নিয়ম পদ্ধতি এমন যে, তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াও ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ বিদ্যমান থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক সময় তার অন্তরে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে। তার অনুভূতির অন্তরালে এ ধরনের ভাব লুকিয়ে থাকে। তা সে অনুভব করতে না পারলেও তার ভিতরে অবচেতনভাবে বিদ্যমান থাকে। ফলে সেখানে নফসের প্রভাব এসে যায়। পক্ষান্তরে রোযা এমন এক পদ্ধতিগত ইবাদত, তার-আকার-আকৃতি এরূপ যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। রোযাদার ব্যক্তি নিজ মুখে রোযার বিষয়টি প্রকাশ না করলে সাধারণত তা আলেমুল গায়েব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়ার মত নয়। তাই রোযার ক্ষেত্রে মাওলার সন্তুষ্টির বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতিভাত হয়। একারণেই রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের মাঝে এরূপ বিস্তর ব্যবধান।

রোযার এত বড় ফযীলতের কারণ এটাও হতে পারে যে, রোযা ধৈর্য্যের ফলস্বরূপ। আর ধৈর্য্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ হল-

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

ধৈর্য্যধারণকারীগণই অগণিত সওয়াবের অধিকারী হবে।-সূরা যুমার (৩৯) : ১০

সব মাখলুকের স্রষ্টা, বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, আল্লাহ তাআলা নিজেই যখন এর পুরস্কার দিবেন, তখন কী পরিমাণ দিবেন? ইমাম আওযায়ী রাহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন- আল্লাহ যে রোযাদারকে প্রতিদান দিবেন, তা মাপা হবে না, ওজন করা হবে না অর্থাৎ বিনা হিসাবেই দিবেন।

২. আল্লাহ তাআলা রোযাদারকে কেয়ামতের দিন পানি পান করাবেন

হযরত আবু মুসা রা. হতে বর্ণিত,

ان الله تبارك وتعالى قضى على نفسه أنه من اعطش نفسه له في صائف سقاه يوم العطش،

رواه البزار، وذكره الهيثمي في المجمع (5095)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون. وقال المنذري في الترغيب (1478)، : إسناده حسن، ان شاء الله.

আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেন, যে ব্যক্তি তার সন্তুষ্টির জণ্য গ্রীষ্মকালে (রোযার কারণে) পিপাসার্ত থেকেছে, তিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিন) পানি পান করাবেন।-মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১০৩৯; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫০৯৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

قال الله تعالى : الصيام لى وانا اجزى به … فان لهم يوم القيامة حوضا ما يرده غير الصائم،

رواه البزار وذكره الهيثمي في المجمع، (5093)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون.

আল্লাহ তাআলা বলেন, রোযা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। কেয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউজ থাকবে, যেখানে রোযাদার ব্যতীত অন্য কারো আগমন ঘটবে না।-মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ৮১১৫; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫০৯৩

৩. রোযা হল জান্নাত লাভের পথ

عن حذيفة رضي الله عنه قال : اسندت النبي صلى الله عليه وسلم إلى صدري، فقال : من قال : لا إله إلا الله ختم له بها دخل الجنة، ومن صام يوما ابتغاء وجه الله ختم له به، دخل الجنة، ومن تصدق بصدقة ختم له بها، دخل الجنة، رواه احمد، وذكره الهيثمى فى المجمع (11935) وقال : رواه احمد ورجاله رجال الصحيح غير عثمان بن مسلم البتى وهو ثقة، فالحديث صحيح كما قاله الشيخ احمد شاكر والشيخ شعيب الارنؤوط.

হযরত হুযায়ফা রা. বলেন, আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার বুকের সাথে মিলিয়ে নিলাম, তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোযা রাখবে, পরে তার মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো দান-সদকা করে তারপর তার মৃত্যু হয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩৩২৪; মুসনাদে বাযযার, হা.২৮৫৪

عن أبي أمامة قال : أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقلت : مرني بعمل يدخلني الجنة، قال : عليك بالصوم، فانه لا عدل له، ثم أتيته الثانية، فقال لي : عليك بالصيام.

হযরত আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগমন করে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। তিনি বলেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় তার নিকট এসে একই কথা বললাম। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২২১৪৯; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ১৮৯৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৪২৬; সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫৩০

৪. রোযাদারগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে ‘রাইয়ান’ নামক বিশেষ দরজা দিয়ে

হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

إن فى الجنة بابا يقال له الريَّان يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال : اين الصائمون فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فاذا دخلوا اغلق، فلم يدخل منه احد.

জান্নাতে একটি দরজা আছে, যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে কেবল রোযাদার ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবে- কোথায় সেই সৌভাগ্যবান রোযাদারগণ? তখন তারা উঠে দাড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অতঃপর রোযাদারগণ যখন প্রবেশ করবে, তখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে কেউ ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৮৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৫২; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২২৮১৮

হযরত সাহল ইবেন সা’দ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

ان للصائمين بابا فى الجنة يقال له : الريان، لا يدخل منه غيرهم اذا دخل آخرهم اغلق، ومن دخل منه شرب، ومن شرب منه لم يظمأ ابدًا.

قال الترمذى : هذا حديث حسن صحيح غريب.

জান্নাতে রোযাদার ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ দরজা আছে, যার নাম রাইয়ান। রোযাদারগণ ছাড়া অন্য কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। যখন সর্বশেষ রোযাদার ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে, তখন সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সে (জান্নাতের পানীয়) পান করবে। আর যে পান করবে, সে কখনো পিপাসার্ত হবে না।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২২৮৪২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস : ১৯০২; সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৭৬৫; সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫৪৪

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

لكل اهل عمل باب من ابواب الجنة يدعون منه بذلك العمل، ولاهل الصيام باب يدعون منه، يقال له : الريان، فقال أبو بكر : يا رسول الله، هل احد يدعى من تلك الأبواب كلها؟ قال : نعم، وارجو أن تكون منهم يا ابا بكر،

প্রত্যেক প্রকারের নেক আমলকারীর জন্য জান্নাতে একটি করে বিশেষ দরজা থাকবে, যার যে আমলের প্রতি অধিক অনুরাগ ছিল তাকে সে দরজা দিয়ে আহবান করা হবে। রোযাদারদের জন্যও একটি বিশেষ দরজা থাকবে, যা দিয়ে তাদেরকে ডাকা হবে, তার নাম হবে ‘রাইয়ান’। আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন কেউ কি হবেন, যাকে সকল দরজা থেকে আহবান করা হবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি আশা রাখি তুমিও তাদের একজন হবে।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৯৮০০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস : ৩২৬২৮

এ সম্পর্কে বুখারী-মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من أنفق زوجين في سبيل الله نودي من أبواب الجنة : يا عبد الله هذا خير، فمن كان من أهل الصلاة دعي من باب الصلاة، ومن كان من أهل الجهاد دعي من باب الجهاد، ومن كان من أهل الصيام دعي من باب الريان، ومن كان من أهل الصدقة دعي من باب الصدقة، فقال أبو بكر : بأبي أنت وأمي، يا رسول الله! ما على من دعي من تلك الأبواب من ضرورة فهل يدعى أحد من تلك الأبواب كلها؟ قال : نعم، وأرجو أن تكون منهم.

(সহীহ বুখারী, হাদীস-১৮৯৬, ৩৬৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০২৭ (৮৫-৮৬); মুসনাদে আহমাদ, হাদীস-৭৬৩৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস -৩০৯)

৫. রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল ও দুর্গ

হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

قال ربنا عز وجل : الصيام جنة يستجن بها العبد من النار وهو لى وانا أجزى به.

وهذا حديث صحيح بطرقه وشواهده، قاله الشيخ شعيب الارنؤوط

আমাদের মহান রব ইরশাদ করেছেন- রোযা হল ঢাল। বান্দা এর দ্বারা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। রোযা আমার জন্য আর আমিই এর পুরস্কার দিব।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৪৬৬৯; শুয়াবুল ঈমান বাইহাকী, হাদীস : ৩৫৭০

উসমান ইবনে আবিল আস রা. বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

الصيام جنة من النار كجنة احدكم من القتال،

রোযা হল জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল, যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের (শত্রুর আঘাত হতে রক্ষাকারী) ঢালের মত।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৬২৭৮; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২১২৫; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৬৪৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৬৩৯

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

الصيام جنة، وحصن حصين من النار

রোযা হল (জাহান্নাম থেকে পরিত্রান লাভের) ঢাল এবং সুরক্ষিত দুর্গ।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস-৯২২৫; বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস-৩৫৭১

৬. রোযা কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام : اى رب منعته الطعام والشهوة فشفعنى فيه، ويقول القرآن : منعته النوم بالليل، فشفعنى فيه، قال : فيشفعان له.

رواه أحمد، والحاكم فى المستدرك وقال : صحيح على شرط مسلم، ووافقه الذهبي، وذكره الهيثمي فى المجمع، وقال : رواه أحمد والطبرانى فى الكبير، ورجال الطبرانى رجال الصحيح.

রোযা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, (অর্থাৎ না ঘুমিয়ে সে তেলাওয়াত করেছে) অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬৬২৬; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ২০৮০; বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস : ১৯৯৪

৭. রোযাদারের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من صام رمضان ايمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه،

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।- সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৮, ২০১৪; সহীহ মুসলিম ৭৬০(১৬৫); মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৭১৭০; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৮৯৬৮

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ان الله عز وجل فرض صيام رمضان وسننت قيامه، فمن صامه وقامه ايمانا واحتسابا خرج من الذنوب كيوم ولدته أمه.

আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর রমযানের রোযা ফরয করেছেন, আর আমি কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ তারাবীহ’র নামাযকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযানের সিয়াম ও কিয়াম আদায় করবে, সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে যেদিন সে মায়ের গর্ভ থেকে সদ্যভূমিষ্ঠ হয়েছিল।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস-১৬৬০, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস-৭৭৮৭, মুসনাদে বাযযার, হাদীস-১০৪৮, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-২২০১, সুনানে নাসায়ী, হাদীস-২৫১৮

৮. রোযা গুনাহের কাফফারা

রোযা গুনাহের কাফফারা হওয়া কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রকার গুনাহের কাফফারা স্বরূপ রোযার বিধান নাযিল করেছেন। যেমন ইহরাম অবস্থায় (অসুস্থতা বা মাথার কষ্টের কারণে) মাথা মুন্ডানোর কাফফারা স্বরূপ (২:১৯৬), কোন যিম্মী বা চুক্তিবদ্ধ কাফেরকে ভুলক্রমে হত্যার কাফফারা স্বরূপ (৪:৯২), কসমের কাফফারা স্বরূপ (৫:৮৯) এবং যিহারের কাফফারা স্বরূপ (৫৮:৩-৪); আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিভিন্ন মেয়াদে রোযার হুকুম দেওয়া হয়েছে। তাই সহজেই বোধগম্য যে, রোযা বান্দার পাপসমূহকে ধুয়ে-মুছে রোযাদারকে পরিশুদ্ধ করে।

হযরত হুযায়ফা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

فتنة الرجل فى اهله وماله ونفسه وولده وجاره تكفرها الصلاة والصيام والصدقة والأمر بالمعروف والنهى عن المنكر.

মানুষের জন্য তার পরিবার, ধন-সম্পদ, তার আত্মা, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশী ফিতনা স্বরূপ। তার কাফফারা হল নামায, রোযা, দান-সদকাহ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫২৫, ১৮৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৮৯২-২৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩২৮০, সুনানে তিরমিযী, হা. ২২৫৮

৯. রোযাদারের মুখের গন্ধ মিশকের চেয়েও সুগন্ধিযুক্ত

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

والذى نفس محمد بيده لخلوف فم الصائم اطيب عند الله من ريح المسك،

সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৫১ (১৬৩); মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৭১৭৪; সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫২৩; সুনানে ইবনে মাজাহ- ১৬৩৮

১০. রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

للصائم فرحتان يفرحهما اذا افطر فرح، واذا لقى ربه فرح بصومه، وفى رواية : اذا لقى الله فجزاه فرح،

রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে, যখন সে আনন্দিত হবে। এক. যখন সে ইফতার করে তখন ইফতারের কারণে আনন্দ পায়। দুই. যখন সে তার রবের সাথে মিলিত হবে তখন তার রোযার কারণে আনন্দিত হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন সে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, আর তিনি তাকে পুরস্কার দিবেন, তখন সে আনন্দিত হবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৯০৪, ১৮৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৫১ (১৬৩, ১৬৪, ১৬৫); মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৯৪২৯, ৭১৭৪; সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৭৬৬

১১. রোযাদার পরকালে সিদ্দীকীন ও শহীদগণের দলভুক্ত থাকবে

হযরত আমর ইবনে মুররা আলজুহানী রা. হতে বর্ণিত,

جاء رجل الى النبى صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله! أرايت ان شهدت ان لا اله الا الله وانك رسول الله، وصليت الصلوات الخمس واديت الزكاة وصمت رمضان وقمته فممن أنا؟ قال : من الصديقين والشهداء،

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি একথার সাক্ষ্য দিই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসূল, আর আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, রমযান মাসের সিয়াম ও কিয়াম (তারাবীহসহ অন্যান্য নফল) আদায় করি তাহলে আমি কাদের দলভুক্ত হব? তিনি বললেন, সিদ্দীকীন ও শহীদগণের দলভুক্ত হবে।-মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ২৫, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২২১২, সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৪২৯

১২. রোযাদারের দুআ কবুল হয়

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إن للصائم عند فطره لدعوة ما ترد.

قال البوصيرى : اسناده صحيح.

ইফতারের সময় রোযাদার যখন দুআ করে, তখন তার দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (অর্থাৎ তার দুআ কবুল হয়)।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৭৫৩

হযরত আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ثلاثة لا ترد دعوتهم الامام العادل، والصائم حتى يفطر، ودعوة المظلوم، تحمل على الغمام، وتفتح لها ابواب السماوات، ويقول الرب عز وجل : وعزتى لانصرنك ولو بعد حين.

وقال الترمذى : هذا حديث حسن.

তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না (অর্থাৎ তাদের দুআ কবুল করা হয়) ন্যায়পরায়ন শাসকের দুআ; রোযাদার ব্যক্তির দুআ ইফতারের সময় পর্যন্ত ও মজলুমের দুআ। তাদের দুআ মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং এর জন্য সব আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, আমার ইয্যতের কসম! বিলম্বে হলেও অবশ্যই আমি তোমাকে সাহায্য করব।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৮০৪৩; সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৩৫৯৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৭৫২; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৪২৮

হযরত আবু হুরায়রা রা. র্বণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

الصائم لا ترد دعوته،

وهذا الحديث اسناده حسن قاله الشيخ محمد عوامة

রোযাদারের দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৮৯৯৫

১৩. রোযা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়

صوم شهر الصبر وثلاثة أيام من كل شهر يذهبن وحر الصدر،

وقال المنذرى : ورجاله رجال الصحيح، ورواه احمد وابن حبان والبيهقى الثلاثة من حديث الأعرابى ولم يسموه، (اى ابن عباس)

হযরত ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সবরের মাসের (রমযান মাস) রোযা এবং প্রতি মাসের তিন দিনের (আইয়্যামে বীয) রোযা অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়। -মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১০৫৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩০৭০; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৬৫২৩

১৪. আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম

عن أبى أمامة قال : قلت يا رسول الله! مرنى بعمل قال : عليك بالصوم فإنه لا عدل له قلت : يا رسول الله! مرنى بعمل قال : عليك بالصوم، فانه لا عدل له.

হযরত আবু উমামা রা. বর্ণনা করেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কোনো আমলের আদেশ করুন। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কোনো নেক আমলের কথা বলুন, তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা এর কোনো সমতুল্য কিছু নেই।-সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ১৮৯৩; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২২১৪০; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৩৪২৫; সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদীস : ২৫৩৩ عن أبى أمامة الباهلى قال : قلت يا رسول الله مرنى بأمر ينفعنى الله به، قال : عليك بالصوم فانه لا مثل له.

هذا حديث اسناده صحيح على شرط مسلم قاله الشيخ شعيب وكذا قاله الشيخ أحمد شاكر.

হযরত আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এমন কোনো আমলের আদেশ করুন, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমাকে উপকৃত করবেন। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা তার তুলনা হয় না।-সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫৩১; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২২১৪১; বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান ৩৮৯৩ তাবারানী, হাদীস : ৭৪৬৩
রমযান হল খালেস ইবাদতের মৌসুম। তাই এ মাসের সময়গুলো যতটা শুধু আল্লাহর সাথে কাটানো যায় ততটা ভালো। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হাদীস অনুযায়ী আমল করার ও উক্ত ফযীলত লাভ করার তাওফীক দান করুন। আমীন। ইয়া রাববাল আলামীন।

মাহে রমযান : পারস্পরিক সহযোগিতা বিবেচনা দায়িত্ব ও ছাড়ের কিছু কথা !

অনন্য ইবাদতের মাস রমযান। এ মাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য মাসব্যাপি রোযা পালন করা। মাসের প্রতিটি দিন উপোস করে, সংযমের সঙ্গে কাটানো। এর সঙ্গে উতপ্রোতভাবে জড়িত সাহরী ও ইফতার-রোযার সূচনা ও শেষের খাবার-উপলক্ষ, আছে তারাবীহ। ফরয নামায ও জরুরি অন্যান্য আমলের পাশাপাশি নফল ইবাদত, তেলাওয়াত এবং দান-খায়রাতের সম্পর্কও এ মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এজন্য দ্বীনী প্রয়োজন ও নিয়মসহ স্বভাবজাত ও বাস্তব নানা কারণে এ মাসটিতে মুসলমানদের জীবনে কিছু ব্যতিক্রমী রুটিন, প্রস্ত্ততি, উপলক্ষ ও প্রবণতা ফুটে ওঠে। এর প্রভাব মুসলিম প্রধান এ দেশটিতে অ-মুসলিমদেরও স্পর্শ করে যায়। এজন্য রমযানের রোযা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত আমল হওয়া সত্ত্বেও এ উপলক্ষে পারস্পরিক নির্ভরতা, সহযোগিতা ও একের প্রতি অন্যের বিবেচনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে চলে আসে। এ বিষয়গুলো আসে বিভিন্ন দিক থেকে। মনোযোগ, বিবেচনা ও সচেতনতা না দিলে এতে বিভিন্ন ধরনের বিপত্তি ও সংকটের সৃষ্টি হতে পারে ও হয়ে থাকে। মাহে রমযানে প্রাসঙ্গিক ও জরুরি এ বিষয়গুলোর প্রতি তাই সচেতন হওয়া আমাদের প্রত্যেকের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুই.

প্রথমেই চলে আসে মুসলিম রোযাদার পরিবারগুলোর ঘরণী বা নারী সদস্যদের কথা। রমযানে ঘরের প্রয়োজনীয় সম্মিলিত আয়োজনগুলোতে তারাই সবচেয়ে বেশি শ্রম ও সময় দিয়ে থাকেন। সংসারের কঠিন কাজগুলোর পাশাপাশি ইফতার, সাহরী, রাতের খাবারের প্রস্ত্ততিসহ পরিবারের রোযাদার সদস্যদের নানা চাহিদা মেটানোর পেছনে অকাতরে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। আবার তারা রোযাও রাখেন। ফরয, ওয়াজিব, নফল ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার আবশ্যকতা ও আগ্রহ তাদের মাঝেও থাকে। রোযাজনিত অবসাদ ও ক্লান্তিও তারা বোধ করেন। কিন্তু পরিবারের পুরুষ-সদস্যরা অনেক সময়ই পরিবারের নারীদের সামর্থ ও সীমাবদ্ধতার এই দিকটির প্রতি চোখ রাখেন না। চাহিদা অনুযায়ী কিংবা মনমতো কিছু একটার ঘাটতি ঘটে গেলে তারা বিরক্তি বা ক্ষোভ লুকিয়ে রাখতে পারেন না। এটা রমযান ও রোযার সংযমনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল নয়। কখনো কখনো এসব ক্ষেত্রে মানসিক জুলুমের ঘটনাও ঘটে যায়-যেটা রমযান-অ-রমযান কোনো অবস্থাতেই অনুমোদিত নয়।

এজন্য এ বিষয়টির প্রতি পূর্ণ সতর্কতা ও সর্বোচ্চ বিবেচনা বজায় রাখা রোযাদার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিলে সমস্যার মাত্রা কমে যাবে বলে আশা করা যেতে পারে। এক. রমযানে নারীদের ঘরোয়া আয়োজনগত সেবার মূল্যায়ন করা। কারো পক্ষ থেকে উপকৃত হলে মানুষ যেমন তাকে কথায়-আচরণে খুশি করার চেষ্টা করে, রমযানে ঘরের নারীদের প্রতি তেমন সৌজন্য ও সদাচার প্রকাশ করা উচিত। দুই. সাহরী-ইফতার ও অন্য যে কোনো আয়োজন এবং সেবায় কখনো কখনো মন ও রুচিমাফিক কিছু না পেলে সয়ে যাওয়া ও ধৈর্য্য ধরা। এ কারণে ঘরণীর প্রতি কোনো রকম তিক্ত আচরণ করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা উচিত। তিন. নিজে রোযাদার হয়েও ঘরণী যে শ্রম ও সময় দিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করার ব্যবস্থা নেওয়া। এটা প্রত্যক্ষভাবে নিজে হাত লাগিয়েও করা যায়। আবার সহযোগী কাজের মানুষের ব্যবস্থা করেও তার কষ্ট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যায়। সময়, পরিস্থিতি ও সুবিধা অনুযায়ী সহযোগিতার ধরণটা ঠিক করে নেওয়া যেতে পারে। চার. রমযানে শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া নফল-মুস্তাহাব পর্যায়ের সেবার জন্য নারীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে না দেওয়া। যেমন পরিবারের কর্তার মনে হল, আজ কয়েকজনকে দাওয়াত করে ইফতারের বিশেষ মেহমানদারি করবেন। এজন্য তিনি ঘরণীর সুবিধা-অসুবিধা, ক্লান্তি ও আয়োজনের শ্রম-কোনোদিকেই খেয়াল করলেন না। তার সঙ্গে আলোচনা করে আগেই তাকে মানসিকভাবে তৈরি করা সম্ভব হল না। তাকে শুধু জানিয়ে দিলেন, এতজন মেহমান আসছেন, এই এই আয়োজন করতে হবে। মেহমানদারির এ পদ্ধতি ঠিক নয়। রমযানে ইফতার করানো অনেক ছওয়াবের কাজ। এটা স্বতন্ত্র বিষয়। ঘরণীর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে আগ্রহ ও উৎসাহের সঙ্গে সেটা করতে উদ্বুদ্ধ করা এটিও স্বতন্ত্র বিষয়। দুটির মাঝে সমন্বয় করেই এ ধরনের পুন্যের উপলক্ষগুলো সমাধা করতে হবে। কিংবা অন্য উপায়ও তো খোলা আছে। বাইরে থেকে ইফতার কিনে এনেও এটা করা যায়। আবার ঘটনা যদি এমন হয় যে, দাওয়াত কিংবা বিশেষ মেহমানদারির কোনো ব্যাপার নেই, মেহমান নিজেই বাসায় চলে এসেছেন, সেক্ষেত্রে পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যেইে সেটি পড়ে যায়। তখন আয়োজন নিয়ে অস্থিরতারও কিছু নেই। যা আছে এবং যতটুকু করা গেল, তাতেই ইফতার করানোর হক আদায় হয়ে যায়।

ঘরণীর প্রতি, পরিবারের নারী সদস্যদের প্রতি সদাচার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের দাবি। রমযানুল মুবারকে এ দাবির জোর ও প্রাসঙ্গিকতা অনেক বেশি। সেজন্য রমযানে এ বিষয়টির প্রতি সবার বিশেষ মনোযোগ থাকা দরকার।

তিন.

রমযানে রোযা রাখা তো প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষেরই আমল। আর রোযার অনিবার্য অনুষঙ্গ হচ্ছে, শারীরিক অবসাদ ও ক্লান্তিবোধ। এ জন্য রমযান মাসে গৃহকর্মীদের প্রতি বিশেষভাবে সদয় ও ছাড়ের দৃষ্টি থাকা উচিত পরিবারে কর্তা-কর্ত্রীদের। পরিবারের সামর্থ ও সুবিধাভেদে গৃহকর্মীদেরও থাকতে পারে নানা পর্যায়। কাজের সহযোগী মহিলা, নিরাপত্তাকর্মী, গাড়ি চালক এবং এ রকম আরও অনেকেই। কোনো কোনো পরিবারে গৃহকর্মী মাত্র একজন থাকতে পারেন, কোথাও হয়ত দিনের খন্ড সময়ের জন্য একজন। তারা যদি রোযাদার হন তাহলে তাদের প্রতি গৃহের অভিভাবকদের কিছু দায়িত্ব চলে আসে। সেটি হচ্ছে, কাজেকর্মে তাদের সহযোগিতা করা। অর্থাৎ যে কাজটি সে একা করত, সেটিতে নিজেও হাত লাগানো যায়। এছাড়া রোযা অবস্থায় নির্ধারিত দায়িত্ব থেকে তার সেবা কিছু কম গ্রহণ করেও এটা করা যায়। অর্থাৎ অন্যান্য সময়ের হিসাব ধরে রমযানে তাকে সবটুকু কাজ করতে বাধ্য না করা। রমযানে তার সেবার বিনিময়ে অন্যান্য মাসের তুলনায় পারিশ্রমিকও কিছু বাড়িয়ে দেওয়া যায়। গৃহকর্মীও আল্লাহর বান্দা, তাকদীর ও তাকসীমে রিযিকের কুদরতী সিদ্ধান্তে সে এখন আমার অধীনস্থ-এ অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রেখে রমযানে তার প্রতি যতটুকু সদয় হওয়া যায়, ততই কল্যাণ। রমযানুল মুবারক ও রোযার প্রতি সম্মানের ছওয়াব এবং অধীনস্থদের প্রতি সদয় ও সদাচারী হওয়ার ছওয়াব হাসিলের সৌভাগ্য এভাবে হাসিল হতে পারে।

একইভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রমযানে রোযাদার কর্মচারীদের ওপর কাজের চাপ কমানোর ব্যবস্থা করা যায়। একজন সুস্থ-সবল ও প্রাণচঞ্চল কর্মীর কাছে যতটুকু সময়ে যতটুকু কাজ নেওয়া হয়ে থাকে, রমযানে রোযাদারের জন্য সেক্ষেত্রে রোযাজনিত ক্লান্তিবোধের প্রতি কিছুটা হলেও সদয় হওয়া অত্যন্ত ছওয়াবের কাজ হবে। মানবিক ও ভ্রাতৃত্বমূলক আচরণ হিসেবেও সেটা গণ্য হবে। এটা অন্যভাবেও করা যায়। কাজের সময়-পরিমাণটাই কমিয়ে দিয়ে তাতে পূর্ণ উদ্যমে কাজ করানোর ব্যবস্থা করা যায়। এতে রোযাদারের প্রতি সদয় আচরণের সুফল ও বরকত প্রতিষ্ঠানটি অন্যভাবে লাভ করতে পারবে বলেই আশা করা যায়-ইনশাআল্লাহ।

আমাদের সমাজে অনেক সময় অর্থ-অপচয়, সময়-অপচয় নিয়ে সচেতনতার প্রসঙ্গ উঠিয়ে একশ্রেণীর মানুষ কেবল ধর্মীয় বিষয়গুলো টেনে আনেন। হজ্ব-কুরবানীর অর্থ-খরচ নিয়ে লম্বা কথা বলেন। অফিস চলাকালে নামাযের বিরতি কিংবা রমযানে রোযাজনিত ক্লান্তির কারণে কর্মঘণ্টা ‘নষ্ট’ হওয়ার গল্প ফাঁদেন। এটা মূলত ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরে থাকার একটি স্বাভাবিক অথচ অবাস্তব প্রবণতা। কারণ এ সমাজে নেতিবাচক কাজে ও গুনাহর খাতে দৈনিক কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়। সেটা তারা ভুলে যান। ফাঁকিবাজি, ইউনিয়ন, অপরাজনীতি ইত্যাদি নেতিবাচক কারণে অফিস-আদালত, কলকারখানায় প্রতিদিন কোটি কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সেদিকে তাদের চোখ যায় না। তাই তাদের ভুলযুক্তির পেছনে না ছুটে ধর্মীয় জরুরি আচরণ-অনুষ্ঠান ও আল্লাহর ইবাদতে কর্মীদের নিমগ্নতার সময়টাকে প্রতিষ্ঠানের জন্য রহমতের কারণ মনে করা উচিত। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে তেমনটিই ঘটতে দেখা যায়।

এক্ষেত্রে জরুরি অপর একটি বিষয়ের উল্লেখ খুবই প্রাসঙ্গিক। সেটি হচ্ছে, রমযানে কাজের ক্ষেত্রে কর্মীদের মাঝে ইচ্ছাকৃত কোনো ধরনের ঢিলেমি না থাকা চাই। গৃহকর্মী বলি আর প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মী বলি, নির্ধারিত সময় ও চুক্তিতে পুরো কাজ করার মানসিকতা ও প্রস্ত্ততি নিজেদের মাঝে লালন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কর্তার দায়িত্ব হচ্ছে রমযানে রোযাদার অধীনস্থদের প্রতি সদয় হওয়া। এটা তার কাজ। কিন্তু কর্মীদের মনে রাখতে হবে, কর্মীদের জন্য এটা অধিকার নয়। তারা তাদের কাজ যথা সময়ে, যথা নিয়মে করার চেষ্টা করবেন। মূলত দু’ দিক থেকে পরস্পরের প্রতি বিবেচনা থাকলে বিষয়টির বিবেচনা ও ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হয়ে যায়।

চার.

রমযানের খাবার জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় একটি জটিল ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ী ভাইয়েরা রমযানুল মুবারকে রোযাদার ভোক্তাদের প্রতি সুবিচার করবেন-এটাই তো ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক সুবিচার ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে পাওয়া যায় না। অথচ এসব ব্যবসায়ী ভাইয়ের অধিকাংশই মুসলিম ও রোযাদার। তারপরও কেন এমন হয়-ভাবলে সবারই মন বিষিয়ে উঠে। এটা কি ব্যবসায়ীদের উপরতলার কয়েকজনের সিন্ডিকেটেই সীমাবদ্ধ, নাকি ‘সুবিধার ভাগ’ নিতে গিয়ে উপর-নিচের সবাই সমান আকাঙ্খী, সাধারণ রোযাদারদের পক্ষে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এটা বের করা কঠিন। কিন্তু ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় জড়িত ব্যবসায়ী সমাজ এখানে রোযাদারদের হা-হুতাশ ও কষ্টের তীরে যে প্রতিমুহূর্তে বিদ্ধ হন-এটা আমরা অনুভব করি। রমযান মাসে রোযাদারদের সঙ্গে ‘চালাকি’ করে ব্যবসা না করলে ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। চোখে দেখা নগদ লাভের বাইরেও লাভ-ক্ষতির অন্য অংক আল্লাহ তাআলার হিসাবে চালু আছে। অনেক সময় সে হিসাব এ দুনিয়াতেও তার দাপট নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তাই রমযানে রোযাদারদের ভোগান্তি কমাতে ব্যবসায়ী ভাইয়েরা ‘বাড়তি’ ও ‘বিশেষ মৌসুমী’ মুনাফার চেষ্টা বন্ধ রাখলে প্রকৃত হিসাবে তারাও লাভবান হবেন। আর রোযাদাররাও স্বস্তি পাবেন। এর ফলে রমযানে রোযাদার ভাইদের বিক্রেতা ও ভোক্তা-দুটি শ্রেণীর মাঝে পরস্পরের হক ও ভ্রাতৃত্বের দাবিও কিছুটা পূরণ হবে।

রমযানে পারস্পরিক সহযোগিতার সঙ্গে জড়িত এরকম আরো বহু ক্ষেত্র সামনে চলে আসে। চলার পথ, কেনাকাটা, যানবাহনে উঠা-বসা ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে অনেক সময়ই পরিস্থিতি এমন হয় যে, কোনো একজনের অনঢ় অবস্থান কিংবা একগুঁয়েমির কারণে জটিলতা তৈরি হয়। এতে অনেকেই ভোগান্তির শিকার হন। এসব ক্ষেত্রে সহনশীলতাই প্রধান অবলম্বন। কেউ হয়তো ভুল করছেন, অপরজন নরম হয়ে, অন্য কেউ কোমলভাবে বুঝিয়ে পরিস্থিতি সহজ করতে উদ্যোগী হলে সবার জন্যই কল্যাণ হয়।

পাঁচ.

রমযানুল মুবারকে সব মুসলিমেরই রোযা রাখার কথা। সে হিসেবে রাস্তায় বের হলে রোযাহীন কোনো মানুষের সাক্ষাত পাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা এরকম নয। রমযানে প্রথম পাঁচ-সাত দিনের পরই রাস্তাঘাটে দেখা যায় রোযাহীন মানুষের উৎকট খাবার-দাবারের আয়োজন। কিছুদিন আগেও এ দৃশ্যটা কেবল ঢাকা শহরের কিছু কিছু জায়গায় সীমিত ছিল। এখন মফস্বলের ছোট শহরগুলোতেও এ জাতীয় লজ্জাহীন খাবার-দাবারের ধুম চোখে পড়ে। রমযানে দিনের বেলায় খানাপিনার এই প্রকাশ্য ও আধা-প্রকাশ্য ব্যবস্থা বা মহড়া শুধু মারাত্মক গুনাহর কাজই নয়, চরম অমানবিক ও বর্বরতাতুল্য কাজ।

আলোচনার জন্য ধরে নিতে পারি এদেশে অ-মুসলিম যারা আছেন তারা তো আর রোযা রাখেন না। তাদের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ-নারীরা বাসার বাইরে এলে বা পথে থাকলে তাদের তো কোথাও না কোথাও খেতে হয়। একই সঙ্গে এ তর্কও ওঠানো যায় যে, মুসলমানদেরও তো অনেকে মুসাফির থাকতে পারেন, কেউ কেউ রোযা না রাখার মতো অসুস্থতায় আক্রান্তও থাকতে পারেন। তারাও তো কোথাও না কোথাও খাবেন। এসব তর্ক আসলে শুধুই তর্ক। এগুলো যুক্তির সীমানার মধ্যে পড়ে না। এই তর্কের বাইরে গিয়ে একথাও বলা যায় যে, বহু লোক তো কোনো কারণ ছাড়াও রোযাহীন থাকতে পারেন, এটাও তো তার অধিকার (!) তাই তারও তো খেতে হবে। হ্যাঁ, আল্লাহ তাকে খাদ্য কিনে খাওয়ার সামর্থ দিয়েছেন, পেটে ক্ষুধা দিয়েছেন, আল্লাহর বিধান দিয়েছেন রোযা রাখার। কিন্তু এর জন্য আল্লাহ কোনো কুদরতি চাপ প্রয়োগ করেন না। বান্দা পয়সার জোরে, সুস্থতার জোরে নিজের ক্ষমতা দিয়ে জাহির করেছেন, তিনি রোযাহীন থাকতে পারেন। তিনি তা করেছেন। তার ফল অবশ্যই তিনি ভোগ করবেন।

অমুসলিম, অসুস্থ, মুসাফির কিংবা অকারণ রোযাহীন যে-ই হোন, তার রোযা না রাখাটাকে হাজার হাজার রোযাদারের সামনে জাহির করার কী আছে! রাস্তার পাশে প্রকাশ্যে খেতে থাকা, হোটেলগুলো প্রকাশ্যে খুলে রাখা, বিড়ি-সিগারেট, চা-পান প্রকাশ্যে চালিয়ে যাওয়ার কী প্রয়োজন! এটা হচ্ছে স্বভাবজাত নির্লজ্জতার পরিচায়ক একটি আচরণ। ইচ্ছা করে মাহে রমযানের অবমাননা, সচেতনভাবে রোযাদারদের কষ্ট দেওয়া ও অসম্মান করার মহড়া এটি।

বাংলাদেশের মতো দেশে রমযান মাসে প্রকাশ্যে যারা খানাপিনা করেন, তারা কেবল ক্ষুধা মেটানোর জন্য এমন করেন না। এর সঙ্গে অত্যন্ত নীচুমানের জীঘাংসা ও ছোটলোকী মেজাজ জড়িত। তাই যারা না বুঝে অন্যের দেখাদেখি এমন করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, যে কোনো কারণেই হোক রমযান মাসে নিজে রোযা রাখতে না পারলেও রমযানুল মুবারক ও সিংহভাগ মানুষ -রোযাদারদের প্রতি সম্মান দেখান। এতে হতে পারে, একদিন আল্লাহ তাআলা আপনাকে বড় ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে দেবেন। আর যারা বুঝেশুনেই এমন করছেন তাদেরকে শুধু বলতে পারি, সামর্থ আর স্বাস্থ্যের জোরে রোযার দিনে প্রকাশ্যে উদরপূর্তির এই ‘ফুটানি’ আল্লাহ তাআলা সহ্য করেন না। এমন দিন তাদের না আসুক যে, টাকা থাকবে, খাবার থাকবে, ক্ষুধা থাকবে, খাওয়ার তীব্র আগ্রহও থাকবে, কিন্তু কিছুই খেতে পারছেন না এবং এভাবেই বছরের পর বছর ‘হর রোজ রোযা’ রেখে পার করতে হবে।

ছয়.

এ পর্যায়ে দেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম কর্মকর্তাদের বিবেচনার জন্য একটি বিষয় আলোচনা হওয়া দরকার। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে শালীনতা-অশালীনতা প্রশ্নে বেশির ভাগ গণমাধ্যমের উপস্থাপন সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও মুবারক রমযান মাসে এ ক্ষেত্রে তাদের উপস্থাপন ও পরিবেশনা একটা সংযমী অবয়ব ধারণ করতে পারে। এটা রমযান মাসের দাবি। এটা রোযাদারদের সংযম চেতনার দাবি। দাবি করেই বলা যায়, রমযানে গণমাধ্যমগুলো অপেক্ষাকৃত সংযমী পরিবেশনা রাখলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে বৈ কমবে না। জরুরি খবরাখবর জানতে গিয়ে, দেশ-বিদেশের অবস্থা দেখতে গিয়ে কবীরা গুনাহর হাতছানির মধ্যে পড়ে যাওয়াটা রোযাদারের জন্য চরম ক্ষতিকারক ও অস্বস্তিকর। রোযাদারও তো মানুষ। রমযানের সংযমের মাঝেও তার পেছনে রিপুর প্ররোচনা চলতে থাকে। সেখানে তার চেষ্টা ও প্রয়োজন থাকে রিপুর ওপর জয়ের। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলো যদি রিপুর সহায়ক শক্তি হয়ে রোযাদারের সংযমের দূর্গে আঘাত করতে থাকে, সেটাতো সমীচীন কাজ হয় না। রিপুর সহযোগী না হয়ে শুদ্ধ সংযমী আত্মার সহায়ক শক্তি হিসেবে গণমাধ্যমগুলো ভূমিকা রাখুক। অন্তত রমযান মাসে। রমযান মাসে কোটি রোযাদারের এমন একটি নির্দোষ প্রত্যাশার মূল্য দিলে গণমাধ্যমের কর্তারাও কল্যাণের ভাগিদার হবেন বলে আমরা আশা করতে পারি।

মাহে রমযানের পবিত্রতার সঙ্গে নানা প্রয়োজনে প্রকাশ্যে বিচরণশীল নারীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম নারীকে পর্দা করে চলার নির্দেশ দিয়েছে। আবরণের মধ্যে নিজেকে ঢেকে চলতে নারীদের ওপর ইসলাম ফরয করে দিয়েছে। এটা সব সময়ের জন্য, বাইরে বের হলে নারীর এভাবেই চলা উচিত। কিন্তু যারা এ নির্দেশটা পালন করেন না, এদেশে তাদের একটি অংশ অ-মুসলিম হলেও বড় অংশটি আসলে মুসলিম। আল্লাহর হুকুমের প্রতি অবাধ্যতার এই আমলটি সেই মুসলিম বোনেরা অন্তত রমযান মাসে যদি বন্ধ রাখতে শুরু করেন তাহলে তাদের সামনে কল্যাণের দরজা খুলে যেতে পারে। মনে রাখার বিষয় হচ্ছে, নারীর পর্দাহীনতা শুধু নারীর নিজের একটি করণীয় আমল পরিহারের বিষয় নয়, এর সঙ্গে পুরুষেরও চোখ ও অন্তরের আমল নষ্ট হওয়ার বিষয় জড়িত। পর্দা না করার গুনাহটা ব্যক্তিগত পর্যায়ের হলে এক ব্যাপার ছিল। কিন্তু এটি তো সংক্রামক একটি গুনাহ। পর্দা না করে যারা আরেকটু খোলামেলা কিংবা টাইটফিট পোশাক পরে বাইরে বের হন তাতে তাদের কোনো মঙ্গল না হলেও স্বভাবগত কারণেই বহু পুরুষের ক্ষতি হয়ে যায়। এজন্য উগ্র-বেপর্দা নারীদের প্রতি অনুরোধ, আপনাদের গুনাহময় নিজস্ব লাইফ-স্টাইলের মাধ্যমে অন্যদের রমযানের সংযমে চিড় ধরানো থেকে বিরত থাকা আপনাদের দায়িত্ব। নিজের ধ্বংস নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা না থাকলেও (হয়তো সেটা আপনার অধিকার (!)) অপরের ক্ষতি তো আপনি করতে পারেন না। রমযান মাসে লজ্জাশীলতার পরিচয় দিয়ে একটু সদয় হয়ে রাস্তায় বের হলে বহু রোযাদার পুরুষের ‘জানটা’ বেঁচে যায়।

সাত.

রমযান মাসে রোযার প্রাণ ও আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা। তারা উদ্যোগী ও তৎপর হলে রমযানের সংযমী পরিবেশ গড়ে তোলা সহজ ব্যাপার। রমযানের বিভিন্ন জরুরি আনুষ্ঠানিকতাগুলো সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। উপরে আলোচিত বেশ কয়েকটি বিষয়ে রাষ্ট্র তৎপর হলে সমস্যাগুলোর সমাধান আপনা থেকেই হয়ে যেত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রের সেক্যুলার চরিত্র দিন দিন যতই খোলাসা হচ্ছে ততই এসব ক্ষেত্রে তার অমনোযোগ ও উন্নাসিকতা বেড়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় এবং ধর্ম সংশ্লিষ্ট জরুরি নৈতিকতার ক্ষেত্রগুলোতে রাষ্ট্রকে ইদানীং দূরবর্তী দর্শকের ভূমিকাতেই বেশি দেখা যাচ্ছে। তারপরও নাগরিক সুবিধা-অসুবিধার অতি সাধারণ ও অতি প্রয়োজনীয় বিবেচনা থেকে কয়েকটি বিষয়ে রমযানে রাষ্ট্রের মনোযোগী ভূমিকা আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।

এর একটি হচ্ছে বিদ্যুৎ। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম, ঘাটতি প্রচুর। এগুলো পুরনো কথা। এর জন্য বর্তমান সরকার বহু হাঁকডাক করেও গত আড়াই বছরে কেন কিছু করতে পারেনি-সে তর্কেও যেতে চাই না। রমযানে লোডশেডিং-এর মাত্রাটা যেন কম থাকে শুধু এটুকুই নাগরিকদের এখনকার দাবি। বিশেষত সাহরী, ইফতার ও তারাবীহর সময়ে দু’ ঘণ্টা করে মোট ছয় ঘণ্টা সময় যেন দেশের কোথাও লোডশেডিং না হয়-এ বিষয়টি নিশ্চিত করা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। এর সঙ্গে যুক্ত হবে যোহর ও আসরের নামাযের সময় আরো দু ঘণ্টা। গত দুটি বিশ্বকাপে শুধু টিভিতে খেলা দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেশজুড়ে নিশি্ছদ্র বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বিদ্যুৎ বিভাগ তার ‘সক্ষমতা’ দেখিয়েছে। রমযানে সে সক্ষমতা না দেখাতে পারলে আগের দেখানো সব সক্ষমতার ভুল অর্থ দাঁড় করিয়ে নিতে বাধ্য হবেন রোযাদার নাগরিকরা।

অপর দুটি ক্ষেত্র হচ্ছে গ্যাস ও পানি। রমযান মাসে এ দুটি ক্ষেত্রে কোনো সংকট ও ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে রোযাদারদের সমস্যার অন্ত থাকে না। এ দুটি খাত নিয়ন্ত্রণে যারা ভূমিকা রাখেন, রমযানে তাদের মনোযোগ ও দক্ষ তৎপরতা দেখতে চায় দেশবাসী। যানজট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের কর্ণধাররা যদি এসব বিষয়ে রমযানে তৎপর না থাকেন তাহলে রোযাদাররা ভোগান্তিতে পড়ে যাবেন, বিষয়টা এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে হয় না। জনগণের ক্ষোভ ও বিক্ষোভের ঘটনাও রাষ্ট্র পরিচালকদের দুশ্চিন্তার কারণে পরিণত হতে পারে। এজন্য এসব ক্ষেত্রে মনোযোগদান নিজেদের প্রয়োজনেই তাদের দরকার।

মাহে রমযানের রোযা ও অন্যান্য ইবাদত-আমলের মধ্য দিয়ে একটি সামগ্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। এজন্য রমযান ও রোযার বিষয়টিকে যার যার ব্যক্তিগত ধর্মপালনের পর্যায়ে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এর জন্য ব্যক্তির পর সমাজ, সমাজের পর রাষ্ট্রের পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতাকে সবারই গুরুত্বের চোখে দেখা উচিত। এটি কেবল এদেশীয় প্রেক্ষাপটের বিষয় নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের সবকটি দেশেই এ মাসের চিত্রে একটি উজ্জ্বল ভিন্নতা ফুটে ওঠে। অমুসলিম-প্রধান দেশগুলোতেও মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে রমযানের পবিত্রতা ও জরুরি আনুষ্ঠানিকতা রক্ষায় জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করে থাকেন। তাহলে আমরা কেন সচেতন হব না? নিজেদের পরিমন্ডলে সহযোগিতা, সদয়তা ও ছাড়ের মধ্য দিয়ে সুন্দর ও কামিয়াব রমযান কাটানোর চেষ্টা আমাদের করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের কবুল করুন।