Aside

খতম তারাবিহ্ ও হাফেজদের হাদিয়া গ্রহন প্রসংগ।

শুরুতেই বলে রাখি, ফতওয়া দেয়ার অধিকার মুফতিদের। সনদধারী মুফতি ছাড়া অন্য কারো তরফ থেকে ফতওয়া দেয়া একদিকে যেমন শরীয়তের দৃষ্টিতেও অনধিকার চর্চা, অপরদিকে আদালতের রায় অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধও। দেশের উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন সনদধারী মুফতি ছাড়া আর কেউ ফতওয়া দিতে পারবেন না। কিন্তু আজকাল যখন দেখি নন-মুফতি হযরতগণ বয়ানের মজমায় জোসের ঠেলায় স্পর্শকাতর হালাল-হারামের মাসআ’লায় ফতওয়া দিয়ে চলেছেন অবাধে, তখন ভাবি তারা কি জানেন, ভিকটিমদের যে কেউ হাইকোর্টে একটি রিট করে যদি বলে ‘অমুক আলেমের সনদ নেই ফতওয়া দেয়ার অথচ তিনি ফতওয়া দিয়ে আমার স্বার্থহানী ঘটিয়েছেন, পাশাপশি সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন…’ তাহলে কী হবে!

‘তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করো না’-আল্লাহপাকের এমন শক্ত আর সরাসরি নির্দেশনার পর রমযানে তারাবীহ’র নামাজ পড়ানো হাফিজদের হাদিয়া দেয়া বা গ্রহণ করা কেমন করে জায়েজ হয়? অথচ; সারাদেশের বেশিরভাগ মসজিদে এই নাফরমানি (!) চলছে। যেহেতু উলামায়ে কেরামের দায়িত্বই হচ্ছে মানুষকে নাফরমানি থেকে বাঁচানো, সেই লক্ষে কিছু আলেম সর্বশক্তি নিয়োগ করে মানুষকে বোঝাচ্ছেন। যারা একটু টানটুন দিয়ে ওয়াজ করতে পারেন, প্রফেশনাল ওয়াইজিনে কেরামের কথা বলছি, তারা দলিল-আদিল্লা দিয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন যেনো ভুলেও তারাবীহ’র হাফিজদের হাদিয়া দেয়া না হয়। এতোবড় পাপ যেনো ভুলেও কেউ না করে। এমন যারা করছেন, ‘আল্লাহপাক তাদের জবানে আরো বরকত দিন’ এই দোয়া করব কি না-ভাবছিলাম। ভাবনারা হোঁচট খেলো আপাতদৃষ্ট অর্বাচিন সহসাঙ্গিক প্রাসঙ্গিকতায়। জানি অতি উৎসাহী সংশ্লিষ্টদের ভাল লাগবে না। কিচ্ছু করার নেই!
দুই \
অবাক হই আমি! গূঢ় বিষয়াদিতে কারো কারো একপাক্ষিক রূঢ়তা আমাকে বিস্মিত করে! ‘তারাবীহ’র হাদিয়া’ বিষয়টির স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় এ নিয়ে এর আগে আর কথা বলিনি। ঠিক করেছিলাম এ প্রসঙ্গে কথা বলব না। মাসআলা-মাসাঈল সংক্রান্ত ব্যাপার-সেপারে মুফতিগণই কথা বলবেন। কোথায় কী বলতে কী বলে বসে আবার গোনাহগার হই। কী দরকার! কিন্তু লক্ষ লক্ষ হাফিজদের পেছনে গুটি কতেক আলেম যেভাবে হামলে পড়েছেন, তাতে মনে হল এ জীবনে জেনে না জেনে পাপ তো আর কম করিনি! হাফিজদের নিয়ে কথা বললে যদি পাপ হয়, হয়ে যাক। আল্লাহ গাফুরুর রাহীম। প্রতি রমযানে দেশের লক্ষ লক্ষ মসজিদে লক্ষ লক্ষ বার আল্লাহর কালাম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করা ও শোনার এই ধারা অব্যাহত রাখবার স্বার্থে কথা বলে সমালোচিত যদি হতে হয়, গালি যদি খেতে হয়, খেলাম না হয়। ইদানীং লেখালেখির কারণে গালমন্দটা একটু বেশিই হজম করতে হচ্ছে।

জানিয়ে রাখি, লিখছি আমার বোধ থেকে। এটি একটি নিরীহ আর্টিক্যাল। কেউ যেনো এই লেখাকে ফতওয়া ভেবে বিভ্রান্ত না হন।

রমযান এলেই তারাবীহ’র নামাজ পড়ানো হাফিজদেরকে হাদিয়া দেওয়া ঠিক কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টিকে নিয়ে এমনভাবে ফতওয়াবাজি শুরু হয়েছে যে, এর প্রভাবে গোঠা সমাজ মারাত্নভাবে বিভ্রান্ত। সাধারণ মুসলমানরা চরমভাবে বিব্রত। আমি জানি না হাফিজদের হাদিয়া দেয়া বন্ধ করে দেয়ার পেছনে যারা জানবাজ সংগ্রাম শুরু করে অশেষ সওয়াব হাসিলের প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়েছেন, পাঁচ মিনিটের জন্য যদি ধরেও নিই এই হাদিয়া শরীয়ত পরিপন্থী, বাংলাদেশে কি এই একটাই খেলাফে শরীয়ত কাজ তাদের চোখে পড়ে? আর কিছু পড়ে না? আচ্ছা যারা এই বিষয়ে বড় বড় কথা বলছেন, তাদের অনেকের অনেক ব্যাপার যে অনেকেই জানে, এটা কি তারা জানেন? থাক, এখনই সেদিকে যেতে চাচ্ছি না।

তিন
তারাবীহ পড়ানো হাফিজদের হাদিয়া দেয়া না-জায়েজ।
কারণ কী?
কারণ হল, কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের বা খতমের বিনিময় নেয়া হারাম।
দলিল কী?
আয়াত তাদের ঠোঁটেই থাকে, “লা তাশতারূ বি-আ’য়াতী সামানান ক্বালীলা” (তোমরা আমার আয়াতকে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করো না)।

-আচ্ছা পাঁচবেলা নামাজে যিনি ইমামতি করছেন, তিনি তো নামাজে কুরআন শরীফই তেলাওয়াত করছেন, নাকি? তাহলে ইমাম সাহেবকে টাকা দেয়া জায়েজ কেন?
-জবাবঃ ওটা তেলাওয়াতের বিনিময় হিশেবে নয়, নামাজ পড়ানোর বিনিময়ে। কারণ, উনারও পেট-পীঠ আছে।
-আচ্ছা ইমাম সাহেবেরটা বৈধ হলে হাফিজ সাহেবেরটা অবৈধ হবে কেন?
এরও জবাব তৈরি আছে। বলা হবে, ফুকাহায়ে কেরাম ঐক্যমত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়ে রেখেছেন ইমাম সাহেবদের বেতন-ভাতা দেয়া যাবে। জানতে চাই ফুকাহায়ে কেরাম ঐক্যমত্তের ভিত্তিতে কোথায় কখন বলেছেন তারাবীহ পড়ানো হাফিজদেরকে হাদিয়া দেয়া যাবে না! আমি চ্যালেঞ্জ করছি, হাদিয়া দেয়া বা নেয়া না-জায়েজ, এমন কথা হানাফি মাজহাবের কোনো কিতাবে একজন আলেমও বলেননি। কেনো তবে খামাখা এই বিভ্রান্তি ছড়ানো! হাদিয়া আর তারাবিহ’র বিনিময়কে গুলিয়ে ফেললে তো হবে না।

বলবেন, ইমামদের টাকা দেয়া না হলে পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়া যাবে না। ইমামকে বেতন না দিলে তিনি চলবেন কেমন করে? তাঁরও তো স্ত্রী-সন্তান আছে। সংসার আছে। আচ্ছা, হাফিজদের কি বিয়ে করা নিষেধ? তাদের কি স্ত্রী-সন্তান থাকতে নেই? আজব অনুভব!

জামাতে নামাজ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তারাবীহ্ওতো সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে কেন আলাদা নিয়ম?
যুক্তির ভাণ্ডারে এরও যুতসই জবাব তৈরি করে রেখেছেন তারা। বলা হয়, তারাবীহ সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিন্তু খতম তারাবীহ বাধ্যতামূলক নয়। কোন কারণে যদি হাফিজগণ তারাবীহ নাও পড়ান, সমস্যা নেই। ইমাম সাহেব আছেন। সুরা তারাবীহ চলবে।
মজার তথ্য হচ্ছে সুরা তারাবীহ’র বিনিময়ে হাদিয়া নেয়া তাদের দৃষ্টিতে জায়েজ। সুরা তারাবীহ’তে কী পড়া হয়? কুরআনের ছোট ছোট সুরাই তো, নাকি? ‘পুরো কুরআন শুনিয়ে হাদিয়া নেয়া নাজায়েজ কিন্তু কিছু অংশ শুনিয়ে পয়সা নেয়ায় দোষ নেই…’ আমি জানি না ঠিক এই কথাটি ত্রিশ পারা কুরআন অথবা সহী হাদিসের কোথায় লেখা আছে! আচ্ছা কিছু সময়ের জন্য মেনে নিলাম, আংশিক নয়, পুরো কুরআন তেলাওয়াত করার অপরাধ(!)করে ফেললে তাকে আর হাদিয়া দেয়া যাবে না। কিন্তু আমাদের দেশের প্রায় সকল মসজিদেই তো দু’জন হাফিজ মিলে ২০ রাকাত নামাজ পড়ান। তার মানে কেউই তো পুরো কুরআন খতম করছেন না। অর্ধেক তেলাওয়াত করেছেন। বলি সুরা তারাবীহ যে লজিক ফিট করে জায়েজ করা হল, এই লজিকখানা এখানে ফিট করতে বাধা দিল কে?

চার
যা আছে কপালে। শুরু যখন আজ করেই ফেলেছি, কিছু কথা তাহলে বলেই ফেলি। সমুদ্রে পেতেছি শয্যা শিশিরে ভয় পেয়ে লাভ নেই! যারা ফতওয়া দিচ্ছেন তারাবীহ’র হাফিজদের কোনো অবস্থাতেই হাদিয়া দেয়া যাবে না, তারা কিন্তু টাকার কথা বলছেন না। বলছেন বিনিময় দেয়া-নেয়া জায়েজ নয়। অবাক হব না কাছের আগামীতে এইসব অতি উৎসাহী আলেমদের যদি বলতে শুনি, “রমযানে তারাবীহ পড়াতে আসা হাফিজকে খাওয়ানোও যাবে না, কারণ, কোন মসজিদে যদি কয়েকজন হাফিজও তারাবীহ পড়েন তাহলে তাদেরকে মহল্লাবাসী খাওয়ায় না, খাওয়ায় শুধু তারাবীর হাফিজদের। তাহলে সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত হয় এই খাবার তারাবীহ’র বিনিময়েই খাওয়ানো হচ্ছে…।”
তাহলে কী করতে হবে?
জিজ্ঞেস করলে তারা হয়ত বলবেন, নিজের গাটের পয়সায় গাড়ি ভাড়া দিয়ে হাফিজকে তারাবীহ পড়াতে আসতে হবে। হোটেলে রোম করে থাকতে হবে আর নিজের পয়সার রেস্টুরেন্টে খেতে হবে! কিছুই আর অসম্ভব মনে হচ্ছে না আমার কাছে।

পাঁচ
সাম্প্রতিক কিছু বছর থেকে লক্ষ করছি রমযান এলেই তারাবীহ’র হাফিজদের হাদিয়া প্রদানের বিরুদ্ধে কিছু সংখ্যক সম্মানিত আলেম খুব শক্ত অবস্থান গ্রহণ করছেন। কোন অবস্থাতেই তারা মেনে নিতে চান না হাফিজরা কিছু পয়সা পেয়ে যাক। পরিষ্কার ভাষায় বলছি, এটা যতটা না শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গিজনিত তাগিদ থেকে, তারচে’ বেশি জেলাসি মনোভাবের কারণে। এদেশে শরীয়ত পরিপন্থি হাজার হাজার সমস্যা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। সমস্যা তাদের নজরে এই একটাই, তারাবীহ পড়ানো হাফিজদের হাদিয়া দেয়া। আমি জানি না দেশের দশ লক্ষ হাফিজ এই আলেমদের কোন্ বাড়া ভাতে ছাই দিল যে, এদের পিছে তাঁরা এভাবে লাগলেন!

যারা ৩০ পারা কুরআন হিফজ করেছে, হাফিজ নয়-এমন যে কারো থেকে তারা সন্দেহাতীতভাবে উত্তম। পবিত্র কুরআনকে আল্লাহপাক কোনো বক্তা বা মুফতির কাছে রক্ষিত রাখেননি। রেখেছেন হাফিজে কুরআনের বুকে, ভালবাসার অক্ষরে খুদাই করে। এই অর্থে লাওহে মাহফুজ আর হাফিজে কুরআনের বুক’র মধ্যে রূহানী একটি সাদৃশ্য বিদ্যমান। উচিত তো ছিল বিজ্ঞ আলেমদের, কুরআন যারা বক্ষে নিল, সেই হাফিজদের বেশি বেশি করে হাদিয়া-তুহফা দেয়ার ফাজাইল বয়ান করা। এটা কুরআনের তা’জিমেই করা দরকার ছিল। সেটা তো তারা করছেনই না বরং কীভাবে এতোগুলো হাফিজকে আর্থিকভাবে আরো বেশি কোনঠাসা করা যায়, এই ফিকিরে মগ্ন! লক্ষ-কোটি মুসলমান ৩০ পারা কুরআন এর বিশুদ্ধ তেলাওয়াত, তাও নামাজে, তাও আবার রমযানে, এই হাফিজদের কল্যাণেই শুনে আসছে, এটা তাদের মনতশির যেহেনে স্থান পায় না!

কুরআনের দুশমনরা কুরআনকে নিশ্চিহ্ণ করার সবরকম চেষ্টা করেই ব্যর্থ হয়েছে। ১৮৬৪-৬৭, তিন বছরে তিন লক্ষ কপি কুরআন পুড়িয়েছে ইংরেজ। কিছুই করতে পারেনি। কুরআন স্বমহিমায় দ্বীপ্য থেকেছে।

দু’টি অবস্থানকে টার্গেট করে সফল হওয়া গেলে পৃথিবীতে কুরআন আর থাকবে না।
এক, লাওহে মাহফুজ।
দুই, হাফিজে কুরআন।
যেহেতু প্রথমটিতে আঘাত হানার ক্ষমতা নেই, অতএব অপারেশন চালাতে হবে এই দ্বিতীয়টিতেই। হাফিজদের হাদিয়া প্রদান নাজায়েজ বানিয়ে দিতে পারলে আস্তে আস্তে হাফিজ তৈরির কারখানাগুলো ছোট হয়ে আসবে। হাফিজরা হবে সমাজের বোঝা। কেউ আর হাফিজ হতে চাইবে না। কোনো বাবা আর তার ছেলেকে নিয়ে হাফিজিয়া মাদরাসার দিকে যাবে না। আর এভাবেই কুরআনকে পৃথিবীর বুক থেকে…
হাফিজদের হাদিয়ার বিরুদ্ধে যারা অতি উৎসাহী, তারা অপরিনামদর্শী মনোভাবের কারণে কুরআন বিদ্বেষী দেশি-বিদেশি কোনো গোষ্টীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছেন কিনা অর্থাৎ তাদের এই কর্মকাণ্ড ওদের প্লানিংকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে কিনা, ইতোমধ্যে অনেকেই সেটা সন্দেহ করতে শুরু করেছে।

ইসলামের নামে দু’টি পক্ষ আছে। সকল যুগেই ছিল। কিছু আছেন ইসলামের নামে ‘মার’ খানেওয়ালা আবার কিছু আছেন ইসলামের নামে ‘মাল’ খানেওয়ালা। মাল খানেওয়ালারা কথা বলেন মাইন্ডসেট থেকে। বিস্মিত হই! নিজে চালনী হয়ে যখন সূই’র ছিদ্র নিয়ে কথা বলাহয়, তখন ভাবি, বোধগুলো সব কোথায় হারিয়ে গেল! দ্বীনি কথাবার্তা বলার বিনিময়ে নিজেরা প্রতিদিন ৩০/৪০ হাজার টাকা কামালে সেটা ঠিক আছে, ঠিক নেই শুধু গরিব ঘরের এক কুরআনে হাফিজ বছরে একবার সারা মাসে ১৫/২০ হাজারটা টাকা পেয়ে গেলে! তাও তাদের মতো কন্টাক করে নয়, মানুষের ভালবাসায়, স্বেচ্ছায়… পরিষ্কার ভাষায় বলছি, হাফিজদের বিরুদ্ধাচরণকে এদেশের মুসলমান কুরআনের বিরুদ্ধাচরণের ড্রেস রিহার্সেল হিশেবেই ভাববে। আর এমনদেরকে জাতি বরদাশত করবে; ভাবা ঠিক হবে না।

ছয়
বলা হবে আবেগি কথা দিয়ে শরীয়ত চলে না। আল হালালু বাইয়্যিন, ওয়াল হারামু বাইয়্যিন। সত্য-মিথ্যা সুস্পষ্ট। জানি তো। আর তাই অতি উৎসাহী যারাই হাফেজদের পেছনে লেগেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বিনয়ের সাথে বলছি, আপনারা যে যতবড় আল্লামাই বনে বসে থাকেন, আন্তরিকভাবে দুঃখিত, আপনাদেরকে আমরা আশরাফ আলী থানবী থেকে বড় আলেম মনে করি না। থানবী রাহ. তো হাফিজদেরকে হাদিয়া দেয়া যাবে-বলেছেন। থানবী রাহ. বলেছেন- চুক্তি করে তারাবীহ’র বিনিময় নেয়া হালাল নয় কিন্তু মানুষ যদি কুরআনের মহব্বতে হাফিজে কুরআনের সম্মানার্থে হাদিয়া-তোহফা হিসাবে কিছু দেয় তাহলে সেটা কেবল বৈধই না; বরং এমন হাদিয়া দাতারা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি প্রতিদান পাবে।

তাহলে কথা পরিষ্কার। তারাবীহ’র বিনিময়ে চুক্তি করে পয়সা নেয়া যাবে না। এমনটি তো কোথাও করাও হয় না। এ কথাতেও কারো দ্বিমত নেই যে, তারাবীহ’র বিনিময় দেয়া ঠিক না। প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে? সব মসজিদেই মুসল্লিদের পক্ষ থেকে হাফিজদেকে স্বেচ্ছায় হাদিয়া দেয়া হয়। হাফিজ সাহেবও বিনিময় চান না আর মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকেও বলা হয়, জনাব, আমাদের তরফ থেকে এটি সামান্য হাদিয়া। এটা তারাবীহ’র বদলা নয়। দয়াকরে গ্রহণ করুন। আমি বুঝতে পারি না এখানে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী ছিলেন এদেশের আহলে হক্ব আলেমদের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছিলেন একজন চৌকষ আলেম। তিনি কিন্তু তারাবীহ’র হাফিজকে নিজে পয়সা উঠিয়ে দিয়েছেন। গহরপুরী হুজুর রাহ’কে আমরা দেখেছি তারাবীহ’র হাফিজদের হাদিয়া দিতে। বলতে শুনেছি, “হাফিজদের মন খুলে দান করো। আল্লাহ খুশি হবেন।” স্বীকৃত প্রায় সকল আলেমকেই দেখেছি হাদিয়ার পক্ষে। আজকাল যারা বাংলা-উর্দু মিলিয়ে কয়েকটি কিতাব পড়ে আল্লামা বনে গেছেন, তাদের খেদমতে আমার জিজ্ঞাসা, সাধারণ মুসলমান কাকে মানবে? থানবী, বায়মপুরি, গহরপুরিদের কথা, নাকি এ যুগের এই আপনাদের! কী মনে করেন? তারা কিতাব বুঝেননি? তারা ভুল করেছেন? তো বুকে সততার এতোই যদি সাহস থাকে, তাহলে একবার বলুন না, আশরাফ আলী থানবী’র মতো মাওলানা কিতাব বুঝেননি, আপনি/আপনারা আল্লামা হয়ে বুঝে ফেলেছেন, আপনাদের নিয়ে আমরা গর্বিত হই!

আর যদি বলেন, কোন আলেমের কথা বা কাজ শরীয়তের দলিল হতে পারে না, তাহলে কী করে আশা করেন আপনাদের কয়েকজনের কথাকে এদেশের মুসলমান দলিল হিশেবে গ্রহণ করে নেবে!

যাদের বুকে আল্লাহ পাক তাঁর কালাম শরীফ আমানত রেখেছেন, তারা অবশ্যই তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ, যাদের বুকে কুরআন নেই। যথেষ্ট জেনে বুঝে এবং দায়িত্ব নিয়েই বলছি, হাদিসের সবগুলো কিতাব যদি কোনো আলেম মুখস্ত করে সত্যিকার হাফিজুল হাদিসও হয়ে যান কখনো, আল্লাহর কসম তাঁর অবস্থান একজন হাফিজে কুরআনের উপরে মনে করব না আমরা। আমরা হাদিসকে কোনো অবস্থাতেই কুরআনে কারীমের উপরে তরজীহ দিতে রাজি হব না।

বললে তো বড় কথা বলা হয়ে যাবে। খতমে বোখারির বিষয়ে কিছু বলা যাবে না কারণ, এটা ইমাম-মুয়াজ্জিন মার্কা খতম নয়। এই খতম মুহাদ্দিসীনে কেরামের খতম। এ বিষয়ে কথা বললে বেয়াদবি হবে। যে কারণে কুরআন খতমের হাদিয়া ১০০ টাকা আর বোখারি খতমের বেলায় আগাম কন্টাক্ট পার হেড ২ হাজার হলেও বেয়াদবি হয়ে যাবার ভয়ে আমরা চুপ থাকি। কথা বলি না। আমরা কখনো প্রশ্ন তুলি না এতে করে কি কুরআনে করীমের উপরে হাদিসকে মূল্যায়িত করা হয়ে যাচ্ছে না! ইমাম বোখারি কত হিজরিতে বোখারি শরীফ লিখেছিলেন, তখন কোনো একজন সাহাবী জীবিত থাকবার সম্ভাবনা ছিল কি না, আর নবী ও সাহাবী থেকে সাবিত নেই-এমন আমল করাকে আকাঈদের ভাষায় কী বলা যায়-এসব নিয়ে আমরা কথা বলি না। মনে মনে মনকে বলি, সম্ভবত আমার উর্ধতন কারো কর্মকাণ্ড নিয়ে কিয়ামতের মাঠে আমাকে জিজ্ঞাসিত হতে হবে না। নবী যদি জিজ্ঞেস করেন আমি আমার রক্তরাঙা বাণীগুলো তোমাদের কাছে গচ্ছিত রেখে এসেছিলাম এগুলো দিয়ে মানুষকে কুরআনের পথে নিয়ে আসবে বলে, বলো দেখি আমার হাদিসকে তোমরা কে কীভাবে কাজে লাগিয়েছো? তখন কে কী করেছেন, সে জবাব তিনিই দেবেন। কার কী!

সাত
ওয়াজের মার্কেট রমরমা-এমন বক্তারাও আজকাল হাফিজদের হাদিয়ার বিরুদ্ধে ‘জিহাদ বিল মাইক উইথ হাদিয়া’ শুরু করেছেন! তাদের উদ্দেশ্যে বিনয়ের সাথে আরজ করি, বাংলাদেশে যদি বয়ানের মওজুর এতোই আকাল পড়ে যায় যে, আর কিছু না পেয়ে নিরীহ হাফিজদের পেছনে লাগতে হয়েছে, তাহলে আমাদের জানান। আমরা আপনাদেরকে বিষয় সাজেস্ট করি। দশ লক্ষ গরিব হাফিজদের রিযিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না। সদয় অবগতির জন্য মনে করিয়ে দিই, তারাবীহ যারা পড়ান, এদের অধিকাংশই গরিব হাফিজ। এদের অনেকের ফ্যামিলিই তাদের উপর নির্ভরশীল। বিশ্বাস করুন এদের ডায়েরী ওয়াজ মাহফিলের তারিখ দিয়ে ভরা থাকে না। আগাম বায়না নিয়ে নসিহত বাণিজ্য করার ক্ষমতা নিয়েও তারা জন্মাননি। আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের পিঁছু ছাড়েন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করবেন।

একবার ভাবুন, জানতে চেষ্টা করে দেখুন তারাবীহ’র পেছেনে এক একজন হাফিজের কত মেহনত কাজ করে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তেলাওয়াত করতে হয় তাদের। জোহরের নামাজের পর থেকে আসর পর্যন্ত আবার তেলাওয়াত। সঙ্গতকারণেই পেটে ক্ষিধা নিয়ে। আসরের পর মসজিদে তেলাওয়াত শোনানো। মাগরিবের পর থেকে এশার আযান পর্যন্ত নাকে-মুখে প্রস্তুতি। তারপর বিশ রাকাত নামাজ পড়ানো… একদিনের তারাবীহ’র প্রস্তুতি থেকে শুরু করে নামাজ পড়ানো পর্যন্ত তাদের শরীর থেকে যত ফোটা ঘাম ঝরে, আমার তো মনে হয় সেই ঘামে আপনারা ভালভাবেই তিনবেলা অজু সেরে ফেলতে পারবেন। এই যে পরিশ্রম, এতো যে ঘাম ঝরানো, সেই মেহনত আর ঘাম ঝরানোর পর সাধারণ সৌজন্যবোধ থেকে আমরা যদি খুশি হয়ে তাদেরকে কিছু হাদিয়া দিই, আর এতে করে যদি আপনাদের দৃষ্টিতে মহা অন্যায় কিছু হয়ে যায়, হয়ে যাক। আমরা থানবী রা.দের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তেই আস্থা রাখতে চাই। রমযানের এই গরমে আমাদেরকে বেশি সওয়াবের ভাগ দেবে বলে আমার হাফিজ ভাইরা যে পরিমাণ পরিশ্রম করে, তার জবাবে আমরা যদি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সামান্য কিছু হাদিয়া তাদের হাতে তুলে দিতে পারি, আর সে কারণে যদি কিছু আলেম নারাজও হয়ে যান, মুসলমানদের কিছুই যায় আসে না।

আট
একটু আগে বলছিলাম, বয়ানের জন্য বিষয়বস্তুজনিত সংকটে ভোগলে আমরা বিষয় দিয়ে হেল্প করতে পারি। আপাতত পবিত্র কুরআনে একটি আয়াতকে সাজেস্ট করি। সুস্পষ্ট আয়াত। আল্লাহপাক নবী-রাসূলগণকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন মানুষকে নসিহত করে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাবেন বলে। নবীগণ তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করে গেছেন। আর বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, আলেমগণ হলেন নায়েবে নবী বা নবীগণের ওয়ারিস। আলেমরা নবীদের রেখে যাওয়া কাজ করে যাবেন নবীগণের তরিকায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেই আলেমকে সত্যিকারের নায়েবে নবী বলা যাবে কি না- এই ফতওয়া দেয়ার ভার মুফতিগণের উপর ন্যস্ত রেখেই এতদসংক্রান্ত পবিত্র কুরআনের আয়াতটি সামনে আনছি। নবীগণ আম জনতাকে নসিহত কীভাবে করতেন, সেটার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহপাক সুরায়ে হুদ এর ৫১ নং আয়াতে বলেছেন, “ইয়া কাওমী লা আসআলুকুম আলাইহি আযরা, ইন আযরিয়া ইল্লা আলাল্লাজি ফাতারানী, আফালা তা’ক্বিলূন…”। নবীগণ তাদের জাতিকে ওয়াজ করতেন আর বলতেন, (হে আমার জাতি! এই যে তোমাদের ওয়াজ করছি, এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে তো কোনো বিনিময় চাইছি না। বিনিময় কিছু পেলে সেটা তাঁর কাছেই পাব যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, কেন তবে বুঝতে চেষ্টা করছো না!) যেহেতু আলেমগণ নায়েবে নবী, সুতরাং ওয়াজ-নসিহতের এই সূত্রটা তাদের বেলায়ও সমানভাবে কার্যকর। টাকার বিনিময়ে নসিহত বা আরেকটু এডভান্স হয়ে দেশে হলে টাকায় আর বাইরে হলে ডলারে, আগাম বিল আদায় করে করে মাইকে সুন্দর সুন্দর কথা বলা, এটা কীভাবে কী- আশাকরি সংশ্লিষ্টরা একটু সবিস্তারে ব্যাখ্যা করবেন।

এমন তথ্যও তো আমাদের হাতে আছে, এডভান্স ডলার প্রদানের শর্তে এবং এডভান্স পেমেন্টের ভিত্তিতে নসিহত পেপারে সাইন করেন কেউ কেউ। কিন্তু আগাম ডলার নিয়ে অসুস্থতার কথা বলে প্রোগ্রামেও যান না পয়সাও ফেরত দেন না। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়েই কথাটি বললাম। সংশ্লিষ্ট কেউ চ্যালেঞ্জ করলে দাগ-খতিয়ানসহ প্রমাণ করে দেয়া যাবে।

নয়
শেষ কথাটি বলে নিই। হাফিজে কুরআনগণ হলেন আল্লাহর বিশেষ মনোনিত কিছু লোক। চাইলেই কারো ক্ষমতা নেই পুরো কুরআন মুখস্ত করে ফেলতে পারে। যারা পেরেছে, সন্দেহ নেই তাদের প্রতি মহান মা’বুদের বিশেষ করুণাদৃষ্টি ছিল বলেই এটা তারা করতে পেরেছেন। আর আল্লাহপাক তার কালামকে যে বুকে আমানত রেখেছেন, আমরা যারা হাফিজ নই, আমাদের থেকে সেই বুকওয়ালারা অসংখ্য গুণ বেশি দামি। চলুন তাদেরকে সেই বুকটির খাতিরে অন্তত সম্মান করি, যে বুকে রয়েছে ৩০ পারা কুরআন। ফতওয়ার মারপ্যাঁচে ফেলে কীভাবে তাদেরকে আরো বেশি কোনঠাসা করা যায়, তার পেছনে মেহনত না করে বরং কীভাবে এই লোকগুলো সমাজে আরেকটু ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারে, সেদিকে মনোনিবেশ করি। আর বিজ্ঞ মুফতিয়ানে কেরামের উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে বলি, যতদূর জানি ইজমা’র দরজা তো বন্ধ হয়ে যায়নি। গুরুত্বসহকারে বসে এই বিষয়টির ব্যাপারে পজিটিভ অ্যাঙ্গেলে একটি ফায়সালায় চলে আসুন। অহেতুক এই বিতর্ককে জিইয়ে রাখলে দিন দিন এটির শাখা-প্রশাখা গজাবে। সেটি নিশ্চয় আগামীর জন্য সুখকর হবে না।
——————-কয়েকজন বন্ধুর অনুরোধে পূণঃ প্রকাশিত

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s