Gallery

বাংলাদেশে পাঠ্যপুস্তকে এত হিন্দু লেখকদের কবিতা-গল্প কেন ?

12687911_184636661894539_8587632079574702235_n.jpg

বাংলাদেশে পাঠ্যপুস্তকে এত হিন্দু লেখকদের কবিতা-গল্প কেন ? এমন প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেন- “আরে বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের কোন কবি-লেখক আছে নাকি? বাংলা সাহিত্যের পুরোটাই তো হিন্দুদের অবদান। তাই বাংলা সাহিত্য পড়তে হলে হিন্দু লেখকদের লেখা ও হিন্দুয়ানী কালচার পড়তে হবে এটাই নিয়ম। তাই অযথা চিল্লা-চিল্লি কইরেন না তো”।

যারা এ ধরনের কথা বলেন থাকেন, তাদের জন্য আমার এ পোস্ট। এ পোস্টে আমি বাংলাসাহিত্যে কিছু মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের নাম উল্লেখ করছি, যারা তাদের সাহিত্য রচনার জন্য সর্বজন বিদিত। আসুন বাংলা সাহিত্যে কিছু মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের নাম জেনে নেই-

(১)শাহ মুহম্মদ সগীর:
মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছেন শাহ মুহম্মদ সগীর। তাঁর কাব্য ইউসুফ-জুলেখা সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪১০) রচিত বলে মনে করা হয়। এর সব পুথি চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা ও পার্শবর্তী ভারতীয় ত্রিপুরা) থেকে পাওয়া গেছে।কুরআনের ইউসুফ নবীর সংক্ষিপ্ত কাহিনী যা ফেরদৌস ও জামীর ইউসুফ-জুলেখায় পল্লবিত, তিনি তা বাংলায় যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তাতে তা একটি মৌলিক কাব্যের মর্যাদা পেয়েছে।

(২) জৈনুদ্দীন :
জৈনুদ্দীন কাব্য রসুলবিজয় রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি গৌড় সুলতান ইউসুফ শাহের (১৪৭৪-৮১) সভাকবি ছিলেন। এর গল্পাংশ ফারসি থেকে নেওয়া। ‘বিজয়’ জাতীয় যে কাব্যধারা মধ্যযুগে প্রাধান্য লাভ করে তদনুসারেই এর নামের সঙ্গে ‘বিজয়’ শব্দটি যুক্ত হয়। কাহিনীতে কিছু ঐতিহাসিক নামের উল্লেখ থাকলেও ঘটনা ঐতিহাসিক নয়।

(৩) মুজাম্মিল:
মুজাম্মিল ১৫শ’ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে বর্তমান ছিলেন। তিনি প্রধানত তিনটি কাব্যের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন: নীতিশাস্ত্রবার্তা, সায়াৎনামা ও খঞ্জনচরিত। আরবির অনুবাদ সায়াৎনামায় সুফিবাদ স্থান পেয়েছে এবং অনুবাদে স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে কাব্যটি আকর্ষণীয় হয়েছে। তাঁর নীতিশাস্ত্রবার্তায় বহু বিষয় লিপিবদ্ধ হয়েছে।

(৪) শেখ কবীর:
শেখ কবীর ছিলেন একজন খ্যাতিমান পদকর্তা। তিনি সুলতান নাসিরুদ্দীন নসরৎ শাহের সময়ে আবির্ভূত হন এবং সম্ভবত তাঁর রাজকর্মচারী ছিলেন।

(৫)আফজাল:
আফজাল আলী ঐযুগের কবিদের অন্যতম। নসিহৎনামা নামে একটি কাব্য এবং তাঁর কয়েকটি পদ পাওয়া গেছে (সম্ভবত ১৬৬২ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত)। এ গ্রন্থে সরল ভাষায় ধর্মোপদেশ আছে।

(৬) সাবিরিদ খান:
সাবিরিদ খান বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা বলে মনে করা হলেও কোনোটিরই সম্পূর্ণ অংশ পাওয়া যায়নি। বিদ্যাসুন্দর, রসুলবিজয় এবং হানিফা ও কয়রাপরী নামে তাঁর তিনটি কাব্যের খন্ডিত পুথি পাওয়া গেছে।

(৭) দোনাগাজী:
দোনাগাজীর বিখ্যাত কাব্য সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল। তিনি সম্ভবত ১৬শ’ শতকের মধ্যভাগে আবির্ভূত হন। তাঁর ভাষা সাধারণ এবং প্রাকৃত-প্রভাব ও সারল্যের মিশ্রণে প্রাচীনত্বের দ্যোতক।

(৮)শেখ ফয়জুল্লাহ :

(৯) দৌলত উজির বাহরাম খান:
দৌলত উজীর বাহরাম খাঁর একটিমাত্র কাব্য পাওয়া গেছে এবং সেটি হলো লায়লী-মজনু; এর রচনাকাল ১৫৬০-৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অনুমান করা হয়। এটি ফারসি কবি জামীর লাইলী-মজনু কাব্যের ভাবানুবাদ; তবে স্বচ্ছন্দ রচনা, কাব্যরস ইত্যাদি গুণে এটি অনন্য।

(১০) মুহম্মদ কবীর :
মুহম্মদ কবীর একটিমাত্র কাব্য মধুমালতী রচনা করেই বিখ্যাত হন। ১৫৮৩-৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কাব্যটি রচিত বলে মনে করা হয়। কাব্যের পরিবেশ ও পরিকল্পনা গুলে বকাওলী জাতীয়।

(১১) সৈয়দ সুলতান (আনু. ১৫৫০-১৬৪৮, কাব্য: নবীবংশ, শব-ই-মিরাজ, রসুলবিজয়, ওফাৎ-ই-রসুল, জয়কুম রাজার লড়াই, ইবলিসনামা, জ্ঞানচৌতিশা, জ্ঞানপ্রদীপ, মারফতি গান, পদাবলি)

(১২) শেখ পরান (আনু. ১৫৫০-১৬১৫, কাব্য: নূরনামা, নসিহৎনামা),

(১৩) হাজী মুহাম্মদ (আনু. ১৫৫০-১৬২০, কাব্য: নূর জামাল, সুরৎনামা),

(১৪) মীর মুহাম্মদ শফী (আনু. ১৫৫৯-১৬৩০, কাব্য: নূরনামা, নূরকন্দীল, সায়াৎনামা),

(১৫) নসরুল্লাহ্ খাঁ (আনু. ১৫৬০-১৬২৫, কাব্য: জঙ্গনামা, মুসার সওয়াল, শরীয়ৎনামা, হিদায়িতুল ইসলাম),

(১৬) মুহম্মদ খান (আনু. ১৫৮০-১৬৫০, কাব্য: সত্য-কলি-বিবাদ-সংবাদ, হানিফার লড়াই, মকতুল হুসেন),

(১৭) সৈয়দ মর্তুজা (আনু. ১৫৯০-১৬৬২, কাব্য: যোগ-কলন্দর, পদাবলি),

(১৮) শেখ মুত্তালিব (আনু. ১৫৯৫-১৬৬০, কাব্য: কিফায়িতুল-মুসল্লীন),

(১৯) আবদুল হাকীম (আনু. ১৬২০-১৬৯০, কাব্য: লালমতী-সয়ফুল্মুল্ক, নূরনামাসহ ৮টি)।

১৬০০ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকজন হলেন
(২০) নওয়াজিশ খাঁ,
(২১) কমর আলী,
(২২)মঙ্গল (চাঁদ),
(২৩)আবদুন নবী,
(২৪)মুহম্মদ ফসীহ,
(২৫)ফকির গরীবুল্লাহ্,
(২৬)মুহম্মদ ইয়াকুব,
(২৬)শেখ মনসুর,
(২৭)শেখ চাঁদ,
(২৮)মুহম্মদ উজীর আলী,
(২৯) শেখ সাদী,
(৩০) হেয়াত মামুদ
(৩১) দৌলত কাজী (আনু. ১৬০০-১৬৩৮)
তাঁর সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী প্রথম মানবীয় প্রণয়কাব্য। তিনি এ কাব্যের রচনা শুরু করেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি; শেষ করেন আলাওল (আনু. ১৬০৭-১৬৮০)। এর মূল কাহিনী আওধী (গোহারি) ভাষায় উত্তর ভারতে প্রচলিত ছিল। কাব্যটি তিন খন্ডে বিভক্ত। এতে কবির অসাধারণ কবিত্বশক্তি ও সৌন্দর্যবোধ ফুটে উঠেছে।

(৩২) মহাকবি আলাওল:
বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে আলাওল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তাঁর মতো বহুগ্রন্থ প্রণেতা ও পন্ডিত কবি মধ্যযুগে বিরল। তিনি আরাকানের প্রধানমন্ত্রী কোরেশী মাগন ঠাকুরের (আনু. ১৬০০-১৬৬০) আশ্রয়ে থেকে কাব্যচর্চা শুরু করেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি বহু সভাসদের অনুগ্রহে কাব্যসাধনা করেন। এ যাবৎ তাঁর যে পাঁচটি কাব্য পাওয়া গেছে তন্মধ্যে পদ্মাবতী শ্রেষ্ঠ। এটি হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবত (১৬৫১) অবলম্বনে রচিত হলেও মৌলিকতার কারণে পাঠকনন্দিত। তাঁর অপর চারটি কাব্যও অনুবাদমূলক এবং সেগুলি হলো হপ্তপয়কর, তোহফা, সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল ও সিকান্দরনামা। এগুলি ছাড়া আলাওল কিছু পদাবলি ও গানও রচনা করেন। তাঁর কাব্যে মানবপ্রেম ও অধ্যাত্মপ্রেম দুয়েরই মিলন ঘটেছে।

(৩২)মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) :
মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন আধুনিক যুগের মুসলমান বাংলা সাহিত্যিকদের অগ্রগণ্য। সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য, গীতিনাট্য, প্রবন্ধ-সাহিত্য, সমাজচিত্র প্রভৃতি বিষয়ে তিনি প্রায় ৩০টি গ্রন্থ রচনা করেন; তবে উপন্যাস ও কাহিনী জাতীয় রচনাতেই তাঁর অবদান সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার খ্যাতিমান এবং প্রতিষ্ঠিত গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন একাধিক নাটক রচনা করেন। তাঁর প্রথম নাটক বসন্তকুমারী (১৮৭৩) সংস্কৃত নাটকের আঙ্গিকে রচিত। এ নাটকের সংলাপে কথ্য ভঙ্গির প্রয়োগ চরিত্রগুলিকে বাস্তবানুগ করেছে। তাঁর দ্বিতীয় নাটক জমিদারদর্পণে (১৮৭৩) সে সময়ের জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনী চিত্রিত হয়েছে।

(৩৩)মোজাম্মেল হক :
মশাররফের পরে অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হলেন মোজাম্মেল হক। গদ্য ও পদ্য রচনায় অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী মোজাম্মেল হক প্রধানত মুসলমান সমাজের জাগরণমূলক কাব্য রচনা করলেও তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে মূলত গদ্যে। তিনি জীবনচরিত ও উপন্যাস রচনায় এবং ফারসি থেকে অনুবাদে কৃতিত্ব অর্জন করেন। মুসলমানদের জন্য সর্বপ্রথম পাঠ্যপুস্তক রচনাও তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব। মূল ফারসি থেকে শাহনামা কাব্যের প্রথমাংশের অনুবাদ তাঁর অমর কীর্তি।

(৩৪)মৌলবি মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন (১৮৩২-১৯০৭),
(৩৫)দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬),
(৩৬)কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১),
(৩৭)শেখ আবদুর রহিম :
শেখ আবদুর রহিমের কৃতিত্ব হজরত মোহাম্মদের (দ.) জীবন-চরিত ও ধর্মনীতি নামে বাঙালিদের মধ্যে প্রথম হযরত (স.)-এর জীবনী রচনা।

(৩৮)রেয়াজউদ্দীন মাশহাদী :
পন্ডিত রেয়াজউদ্দীন আহমদ মাশহাদী সমাজ সংস্কারক গ্রন্থের জন্য সমধিক খ্যাত। মুসলমান সমাজকে সংঘবদ্ধ করা এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে জামালুদ্দীন আফগানীর বৈপ্লবিক চিন্তাধারা প্রচারের কারণে প্রকাশের অল্প পরেই এ গ্রন্থটি সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

(৩৯)মুনশি মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ (১৮৬২-১৯৩৩),
(৪০)মৌলবি মেয়রাজউদ্দীন আহমদ (১৮৫২-১৯২৯),
(৪১)মুনশি মোহাম্মদ জমিরউদ্দীন (১৮৭০-১৯৩০),
(৪২)আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ী (১৮৪৫-১৯১৫),
(৪৩)আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩),
(৪৪)নওশের আলী খান ইউসুফজয়ী (১৮৬৪-১৯২৪),
(৪৫)মওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০)
(৪৬)মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩),

(৪৭) গোলাম হোসেন: প্রথম মুসলমান নাট্যকার। নাটক হাড়জ্বালানী মুদ্রিত হয় ১৮৬৪ সালে। এটি পূর্ণাঙ্গ নাটক নয়, নাট্যরীতিতে সংলাপের মাধ্যমে অঙ্কিত কয়েকটি সমাজচিত্র। মুসলমান রচিত গদ্য পুস্তকের প্রথম নিদর্শন হিসেবেই প্রধানত এর মূল্যায়ন করা হয়। প্রায় একই সময়ে রচিত আজিমদ্দীর কড়ির মাথায় বুড়োর বিয়ে একটি প্রহসন (২য় সংস্করণ ১৮৬৮)।

(৪৮)মুনশি মেহেরুল্ললাহ (১৮৬১-১৯০৭) এবং
(৪৯)মুনশি মোহাম্মদ জমিরউদ্দীন (১৮৭০-১৯৩০)।
নোট: ১৮৬০-৭০ দশকে ইংরেজ রাজশক্তি ফরায়েজী প্রভৃতি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করলে পরবর্তী ২০-২৫ বছর বঙ্গদেশে অনুরূপ আন্দোলন আর দেখা যায় নি। এক সময় খ্রিস্টধর্ম মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। শতাব্দী শেষে এর প্রতিকারে অবতীর্ণ হন মুনশি মেহেরুল্ললাহ ও তাঁর শিষ্য মুনশি মোহাম্মদ জমিরউদ্দীন। আর এঁদেরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সে যুগের মুসলমান বাঙালিকে সাহিত্যিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বজাতি-অভিমুখী করে তোলে একটি বিশেষ দল ‘সুধাকর’, যার প্রধান ছিলেন মৌলবি মেয়রাজউদ্দীন আহম্মদ, পন্ডিত রেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদী, মুনশি শেখ আবদুর রহিম (১৮৫৯-১৯৩১) এবং মুনশি মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ। এঁরা ইসলামি ঐতিহ্য এবং জাতীয় ইতিহাস সম্বন্ধে মুসলমানদের সচেতন করে তোলার জন্য মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্য সৃষ্টি করেন এবং সংবাদপত্রাদির মাধ্যমে ধর্ম ও কৃষ্টিমূলক বিষয়বস্ত্তর প্রচার-প্রসারের জন্য কিছু বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করে সাহিত্যক্ষেত্রে এক পৃথক ধারার সূত্রপাত করেন। তাঁদের প্রথম প্রকাশনা হচ্ছে এসলাম তত্ত্ব। পরে শেখ আবদুর রহিম ও মুনশি মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ সুধাকর নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন (১৮৮৯)। যদিও সুধাকর-দলের আগেও বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির পথে মুসলমান বাঙালিদের কেউ কেউ অগ্রসর হয়েছিলেন, কিন্তু বাংলায় মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা এঁদের আগে আর কেউ করেননি; স্বজাতীয়তাবোধও এমনভাবে বাংলা সাহিত্যে ফুটে ওঠেনি। এক কথায় সুধাকর-দলই মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি রচনা করে। এঁদের রচিত সাহিত্যের মূল্য যেমনই হোক, পরিপ্রেক্ষিত বিচারে বাংলা সাহিত্যে তার গুরুত্ব অপরিসীম।
মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্ললাহর সুপ্ত প্রতিভার জাগরণ ঘটে খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে প্রবল সংঘর্ষের ফলে। তাঁর নয়টি গ্রন্থের মধ্যে সাহিত্যিক বিচারে মেহেরুল এসলাম উল্লেখ্য এ কারণে যে, পুথির আদর্শে লিখিত এর গোড়াতে রসুলে করিম (স.)-এর নাত (স্ত্ততি) আছে, যা পরবর্তী বহুকাল যাবৎ দরুদশরিফের মতো আবৃত্ত হতো। এর ভাষা অত্যন্ত সহজ ও লালিত্যময়। মুনশি মোহাম্মদ জমিরউদ্দীন প্রথমে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে পাদ্রি জন জমিরউদ্দীন নামে পরিচিত হন। পরে ধর্মবিষয়ক বাদানুবাদে পরাজিত হয়ে তিনি পুনরায় মেহেরুল্ললাহর নিকট ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মুনশি জমিরউদ্দীন নাম নিয়ে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। মূলত ইসলাম প্রচার ও তার সেবাতেই তাঁর লেখনী সক্রিয় ছিল এবং এতেই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। শেখ আবদুর রহিম বাংলা ভাষার মাধ্যমে যেভাবে বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহ্য সন্ধান এবং মানব সভ্যতায় ইসলামের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করেন, তেমনিভাবে আর কেউ করেননি। তাঁর প্রথম গ্রন্থ হজরত মহাম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি (১৮৮৭) তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তিনি সুধাকর, মিহির, হাফেজ, মোসলেম প্রতিভা, মোসলেম হিতৈষী প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মোহাম্মদী পত্রিকায় তিনি যেসব প্রবন্ধ লেখেন তা থেকে সেকালের মুসলিম বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন একাধারে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজসেবক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সুবক্তা। তিনি প্রধানত ইতিহাসমূলক রচনার জন্যই খ্যাতি লাভ করেন। ভারতে মুসলমান সভ্যতা তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি। তিনি মিহির ও সুধাকরে লিখে সাহিত্যিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং পরে সোলতান ও আমীর পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। মুসলিম জাতির হূতগৌরব ফিরে পাওয়ার চিন্তাই ছিল তাঁর সাহিত্যসাধনার মূল প্রেরণা।

(৫০) দীন মোহাম্মদ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৫৩-১৯১৬),
(৫১) মুনশি আবদুল লতিফ (১৮৭০-১৯৩৬),
(৫২) শেখ আব্দুল জববার (১৮৮১-১৯১৮),
(৫৩) এয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৮-১৯৪০),
(৫৪) কাজী আকরম হোসেন (১৮৯৬-১৯৬৩) প্রমুখ।

নোট: বিভাগপূর্ব বাংলার একজন কংগ্রেসভক্ত জাতীয়তাবাদী নেতা হয়েও ইসলাম ও মুসলমানদের সেবায় সাহিত্যচর্চা করে আবদুল লতিফ খ্যাতি অর্জন করেন। ইসলামের ইতিহাস (১৯২৪) গ্রন্থটি রচনা করে সুবিখ্যাত হলেও কাজী আকরম হোসেন সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। এয়াকুব আলী চৌধুরীর মতো পন্ডিত সাহিত্যিক ওই সময়ে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কমই ছিল। তাঁর দার্শনিক চিন্তাশীলতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মানব মুকুট। এ গ্রন্থে নবী মুহাম্মাদ (সঃ)-এর জীবনী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর ভাষা হয়ে উঠেছে অপূর্ব ধ্বনিব্যঞ্জনাময়।

(৫৫) জসীমউদ্দীন:
জসীমউদ্দীন কাব্যচেতনার কারণে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেন। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্য প্রাধান্য পাওয়ায় তিনি ‘পল্লিকবি’ উপাধিতে ভূষিত হন।

(৫৬)প্রবন্ধসাহিত্য সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪),
(৫৭)হুমায়ুন কবির (১৯০৬-১৯৬৯),
(৫৮)আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-১৯৮২)
(৫৯)আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮) এবং
(৬০)কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০)।

(৬১) মোহাম্মদ নজিবর রহমান (১৮৬০-১৯২৩):
তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আনোয়ারায় (১৯১২) তৎকালীন মুসলিম বাঙালি পরিবারের আদর্শ চিত্রায়িত হয়েছে। এটি বহুকাল বাংলার মুসলমানদের ঘরে-ঘরে পঠিত হয়েছে। তাঁর অন্যান্য রচনাও জীবনঘনিষ্ঠ। সাহিত্যে অবদানের জন্য নজিবর রহমান ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন।

(৬২)একরামুদ্দীন আহমদ (১৮৭২-১৯৪০) ছিলেন এ যুগের শক্তিমান লেখকদের অন্যতম।

(৬৩)কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬) প্রসিদ্ধি অর্জন করেন তাঁর আবদুল্লাহ (১৯৩২) উপন্যাসের জন্য।

(৬৪)শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩): একজন নিরহঙ্কার সাহিত্যসাধক ও কবি হিসেবে খ্যাত। রূপছন্দা (১৯৪৩) তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য।

(৬৫)গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪): সাহিত্যচর্চার ব্যাপ্তি বিভাগপূর্ব কাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান পর্যায়েও বিস্তৃত।বাংলা সাহিত্যে ইসলামি ভাবধারার রূপায়ণ ছিল তাঁর সাহিত্যসাধনার প্রধান লক্ষ্য। গোলাম মোস্তফার সেরা রচনা বিশ্বনবী (১৯৪২) রসুলুল্লাহ্ (সঃ)-র শ্রেষ্ঠ জীবনী গ্রন্থগুলির অন্যতম। এ গ্রন্থে তাঁর গদ্যবৈশিষ্ট্য চূড়ান্তরূপ লাভ করেছে।

(৬৬)মোহাম্মদ আকরাম খাঁ,
(৬৭)মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৮৮৫-১৯৬৯),
(৬৮)মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬),
(৬৯)এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১),
(৭০)নুরুন্নিসা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী (১৮৯৪-১৯৭৫),
(৭১)শেখ মুহম্মদ ইদরিস আলী (১৮৯৫-১৯৪৫),
(৭২)আকবরউদ্দীন (১৮৯৫-১৯৭৯)
(৭৩)আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮),
(৭৪)কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১),
(৭৫)মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ্ (১৮৯৮-১৯৭৪),
(৭৬)আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯)

(৭৭) কাজী নজরুল ইসলাম ( মে ২৫, ১৮৯৯–আগস্ট ২৯, ১৯৭৬) :
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় অগ্রণী বাঙালি কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, ও দার্শনিক যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

(৭৮)বেনজীর আহমদ (১৯০৩-১৯৮৩),
(৭৯)আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩),
(৮০)মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬),
(৮১)মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন (১৯০৪-১৯৮৭),
(৮২)আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪),
(৮৩)বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯)
(৮৪)মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা (১৯০৬-১৯৭৭),
(৮৫)হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী (১৯০৬-১৯৬৬),
(৮৬)মাহবুবউল আলম (১৯০৬-১৯৮২),
(৮৭)মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০৬-১৯৮২),
(৮৮)সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-১৯৭৫),
(৮৯)রওশন ইজদানী (১৯১৭-১৯৬৭) প্রমুখ।
(৯০)মোহাম্মদ নজিবর রহমান,
(৯১)কোরবান আলী,
(৯২)শেখ ইদরিস আলী,
(৯৩)কাজী ইমদাদুল হক,
(৯৪)কাজী আবদুল ওদুদ,
(৯৫)আকবরউদ্দীন,
(৯৬)আবুল ফজল : পথের যাত্রী (১৯৪৮) ও রাঙ্গা প্রভাত (১৯৫৭) উল্লেখযোগ্য।
(৯৭)হুমায়ুন কবির
(৯৮)কাজি আফসারউদ্দীন: চর-ভাঙ্গা চর (১৯৫১)
(৯৯)শামসুদ্দীন আবুল কালাম: কাশবনের কন্যা (১৯৫৪) ওআলম নগরের উপকথা (১৯৫৪)
(১০০)সরদার জয়েনউদ্দীন
(১০১)ইসহাক চাখারী,
(১০২)আকবর হোসেন,
(১০৩)দৌলতুন্নেসা
(১০৪)শামসুদ্দীন আবুল কালাম: অনেক দিনের আশা (১৯৫২), পথ জানা নেই, ঢেউ।
(১০৫)শাহেদ আলী: জিবরাইলের ডানা (১৯৫৩);
(১০৬)আলাউদ্দিন আল আজাদ

(১০৭)ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪):দেশবিভাগের পরে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসকে অবলম্বন করে রোম্যান্টিক ভাবধারা-সম্পন্ন কবিতা রচনার প্রবণতা প্রকট হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নিয়ে রচিত কবিতাও বিশেষ স্থান দখল করে। এ ভাবধারার প্রধান কবি ছিলেন ফররুখ আহমদ। ধর্মীয় বিশ্বাসকে কবিতার আবেগে রূপান্তরিত করে তিনি সার্থক কাব্যজগৎ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। তাঁর রচিত সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), সিরাজাম মুনীরা (১৯৫২) প্রভৃতি এ পর্বের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

(১০৮) আহসান হাবীব (১৯১৮-১৯৮৩),
(১০৯) আবুল হোসেন (জ. ১৯২১),
(১১০) গোলাম কুদ্দুস এবং
(১১১) সৈয়দ আলী আহসান (জ. ১৯২২)
(১১২) সৈয়দ আলী আহসান,
(১১৩) মুফাখখারুল ইসলাম,
(১১৪) ছদরুদ্দীন,
(১১৫) সুফী জুলফিকার হায়দার

সত্যি বলতে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি লেখকদের অবদানের শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাস, বঙ্গিমচন্দ্র আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যখন পতিতাপল্লী আর পতিতা নিয়ে সাহিত্য রচনা করতে ব্যস্ত, তখন বাঙালী মুসলিম সাহিত্যিকরা অনেক মূল্যবান, ইতিহাসসমৃদ্ধ ও শিক্ষনীয় সাহিত্য উপহার দিয়েছে বাঙালী জাতিকে। অথচ দেখা যাচ্ছে আজকাল ঐ সকল মূল্যবান মুসলিম সাহিত্য ফেলে বাংলাদেশের বেকুব মুসলমানরা বেছে নিয়েছে সেই সোনাগাছির কুসংষ্কারাচ্ছন্ন সাহিত্যকেই। এমনকি বাংলাদেশ ও মুসলমান বিরোধী সাহিত্য গ্রহণ করতেও দ্বিধাবোধ করছে না।

আসলে বর্তমানে বাংলাদেশী মুসলমানরা মারাত্মক অবুঝ হয়ে গেছে, তাই ভালোটা ফেলে এখন মন্দটাতেই মজা পেয়েছে, গলধঃকরণ করছে গোগ্রাসে…..

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s