Gallery

স্ত্রীর স্বামীকে সিজদাহ করার হুকুম, পুরুষ কি নারীদের দ্বিতীয় ঈশ্বর?

images (1).jpg

ইসলামের সমালোচকরা দাবি করে যে, ইসলাম পুরুষকে একচেঁটিয়া মর্যাদা দিয়েছে এবং নারীদের অবহেলা করেছে।ইসলাম পুরুষকে নারীর দ্বিতীয় ঈশ্বর বা আল্লহর মর্যাদা দিয়েছে।নাউজুবিল্লাহ।তারা তাদের দাবির পক্ষে যে হাদিসটি উল্লেখ করে তাহলো আল্লহ ব্যতীত অন্য কারো সিজদাহ করার বিধান থাকলে আমি স্ত্রীদের বলতাম তাদের স্বামীকে সিজদাহ করতে। হুমায়ুন আজাদ তার “নারী” এবং “দ্বিতীয় লিঙ্গ” বইতে এবং বিজ্ঞান মনস্ক লেখকরা তাদের অনেকগুলো বইতে এ হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।

তাছাড়া হাদিসটির শব্দগুলো তারা এমনভাবে উপস্থাপন করে; যেকোন নারী এ হাদিস দ্বারা বিভ্রান্ত হতে পারে।

প্রথমে বলি হাদিসটি কখনোই পুরুষকে দ্বিতীয় ঈশ্বরের মর্যাদা দেয় নি।কারণ নবী সাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন, যদি বিধান থাকত…..অর্থ্যাৎ বিধান নেই। সুতরাং এ হাদিস দিয়ে রেফারেন্স টেনে পুরুষকে দ্বিতীয় ঈশ্বরের দাবি করা অযৌক্তিক।

এ হাদিস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব

হাদিসটি গভীরভাবে চিন্তা না করলে নারী সমাজ ভাববে ইসলাম তাদের অবহেলা করেছে।ইসলাম তাদেরকে কেবল দাসীর মর্যাদা দেয়, এমন চিন্তা তাদের মনে আসতেই পারে ;আর এ সুযোগে সমালোচকরাও ফায়দা লুটে নেয়।

আমাদের আগে হাদিসটি ভালো করে পড়তে হবে।হাদিসটিতে বলা হচ্ছে “আল্লহ ব্যতীত কারো সিজদাহের বিধান থাকলে” নবী সাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম “স্ত্রীদের তাদের স্বামীর সিদাহ” করতে বলতেন।সুতরাং স্পষ্ট স্ত্রীর তার স্বামীকে সিজদাহ করার বিধান ইসলামে নেই। অথচ বর্তমান বাঙালী সমাজে কোনো মেয়েকে কেবল তার স্বামী নয় বরং বংশের সকল বয়োজ্যেষ্ঠদের নিকট মাথা নিচু করতে হয়! এ প্রথার বিরুদ্ধে কিন্তু সমালোচকদের কলম চলে না অথচ ইসলামের ট্যাগ দিয়ে এইসব বিষয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যেতে পারে।এই দ্বিমুখী নীিত কেন?

পুরুষকে দ্বিতীয় ঈশ্বর বলার কোনো যৌক্তিক হাদিস নেই। বরং এ ধরনের কথা আছে হিন্দুধর্মগ্রন্ধেঃ

The wife should present herself to her guru-husband just as the disciple presents himself to his spiritual master. That is bowing down at his feet, approaching him with folded /hands, never arguing, being full of veneration and respect etc. And if she is fortunate ,enough that Krishna gives her a husband who is a pure devotee, than she will automatically attain to the perfection of her husband.
A husband is the supreme demi god for a woman.[1]
এত স্পষ্ট কথাগুলো সমালোচকদের তো উল্লেখ করতে দেখি না!
আচ্ছা এখন আসি এখানে সিজদাহ বলতে কি বুঝানো হয়েছেঃ উক্ত হাদিসে সিজদাহ বলতে স্বামীদের সম্মান করতে বলা হয়েছে। যেহেতু একজন নারীর অভিভাবক তার স্বামী এবং তার স্বামী তার জন্য অর্থ ব্যয় করে।[2] এজন্য বলা হচ্ছে স্বামীকে সম্মান করতে। স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে সম্মান আশা করে। প্রত্যেক নারীই তার স্বামীকে সম্মান এবং ভালবাসার দৃষ্টিতে দেখে। নারী তার জীবনের সবচেয়ে বেশি মুহূর্ত তার স্বামীর সাথে কাটায়, একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়। কুরআনে বলা হয়েছে নারী পুরুষ একে অপরের পোষাক। কুরআন এবং হাদিসে অসংখ্য নির্দেশ এসেছে কিভাবে একে অপরকে ভালবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে। উক্ত হাদিসটিও তাই। জাপানীদের দেখবেন যে তারা একে অপরকে সম্মান প্রদর্শন করতে মাথা নিচু করে। তার মানে এ নয় যে, সে তার প্রভু বা মাস্টার।এটা শুধুমাত্র সম্মান প্রদর্শনের জন্য। অনেক হাদিস স্ত্রীকে সম্মান করতে এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে বলে।আর এ হাদিস দ্বারা পুরুষ নারীর প্রভু এ কথা প্রমাণ হয় না। কারণ কুরআন বলছে নারী-পুরুষ একে অপরের পোশাক বা সহযোগী। তাহলে তো এটাও বলা যায় নারীও পুরুষের প্রভু।কিন্তু এ যুক্তি কিন্তু আমরা আনি না। বছরের পর ধরে হয়তো অনেক মুসলিম তাদের স্ত্রীকে এ হাদিস দ্বারা তাদের স্বার্থ হাসিল করেছে কিন্তু আপনি এতে ইসলামের ভুল ধরতে পারেন না বরং ঐ ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাড় করান।

নবীর আগমনের পূর্বে যদি এ হাদিস দেখানো হতো তাহলে মানুষ তা সহজভাবেই নিত।কারণ পূর্বে সম্মান প্রদর্শনে সিজদাহ করার রীতি প্রচলিত ছিল। রাজা, পিতা, বয়োজৈষ্ঠ্য কিংবা সম্মানের অধিকারীদেরকে সিজদাহের মাধ্যমে সম্মান করা হতো।পরে এ রীতি বাতিল করা হয়। কুরআন এর সাক্ষী।ফেরেশতাদের দ্বারা হযরত আদম আঃ কে সিজদাহ করার আয়াত হয়তো আপনারা ভুলেন নি।এর মাধ্যমে কিন্তু হযরত আদম আঃ ফেরেশতাদের প্রভু হয়ে যান নি।

“এবং যখন আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।”[3]

এবার কি বলবেন হযরত আদম আঃ ফেরেশতাদের প্রভু? নাকি ফেরেশতাদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিজদাহ করতে বলা হয়েছিল! উত্তর পরিষ্কার সম্মান প্রদর্শনের জন্য। তবে পরবর্তীতে এ নির্দেশ বাতিল হয়।আর এজন্য নবী সাঃ বলেছেন “যদি নির্দেশ থাকত তাহলে” অর্থ্যাৎ এখন আর নির্দেশ নেই।

পূর্বে সিজদাহ করার বিধান ছিল যা কুরআন দ্বারা স্পষ্ট, তারপরও নিচের হাদিসগুলো দেখুনঃ

হযরত ইউসুফ আঃ এর ব্যাপারে রয়েছে যে,তিনি তার পিতাকে সিংহাসনে বসিয়ে দেন এবং সবাই সিজদাহে পড়ে যান।এবং ইউসুফ আঃ বলেন, হে, আমার পিতা! ইহায় আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা আমার প্রভু সত্যরুপে দেখিয়েছেন।[4]
অর্থ্যাৎ পূর্ববর্তী উম্মতদের যুগে সিজদাহের রীতি প্রচলিত ছিল কিন্তু আমাদের জন্য এ বিধান রহিত। এবং নবী সাঃ ও ঠিক তাই বলছেন যদি বিধান থাকত তাহলে তিনি নির্দেশ দিতেন।

আল্লহ বলেন, “তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে।”

হযরত মুয়ায রাঃ বলেন, আমি সিরিয়াবাসীকে তাদের নেতৃবৃন্দ এবং আলেমদের সিজদাহ করতে দেখেছি। তখন আমি রাসূল সাঃ কে বলি, হে, আল্লহর রাসূল সাঃ আপনি সিজদাহ পাবার বেশী হকদার।তখন নবী সাঃ বলেন, যদি আমি কোনো মানুষকে কোনো মানুষের সামনে সিজদাহ করার অনুমতি দিতে পারতাম তাহলে স্ত্রীদের বলতাম তাদের স্বামীকে সিজদাহ করতে।কারন তাদের উপর তাদের স্বামীদের বড় হক আছে।[5]

এ থেকে স্পষ্টত এটা শুধু সম্মান প্রদর্শনের জন্য। যদি সিজদাহের বিধান থাকত তাহলে তা হতে পারত যে কারো ক্ষেত্রে যে সম্মান প্রাপ্তির আশা রাখে। তাই এ হাদিস উল্রেখ করে পুরুষকে দ্বিতীয় ঈশ্বর বানানো এবং ইসলামের সমালোচনা অযৌক্তিক। আর এটাও ভুলে যাবেন না যে, নবী সাঃ সিজদাহ করার নির্দেশ দেন নি।বরং তিনি বলেছেন, স্বামীদের হক আছে স্ত্রীদের উপর। আর যদি নির্দেশ থাকত সেটা কেবল স্বামীই নয় বরং হতে পারত পিতা মাতা এবং বয়োজ্যেষ্ঠ যে কেউ।
আপনি হয়তো বলবেন তাহলে কি ইসলাম নারীদের সম্মানের কথা বলে না? কেন বলবে না? বরং ইসলামই একমাত্র নারীমুক্তির পথ।এজন্য পশ্চিমা দেশগুলোর মহিলারা বিপুল পরিমাণে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করছে।ইসলাম নারীদের দিয়েছে মর্যাদা এবং সম্মান।একজন মুসলিম স্বামীর তার স্ত্রীর প্রতি অনেক দ্বায়িত্ব রয়েছে।

‘যেমন নারীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমন তাদের
জন্যও অধিকার রয়েছে ন্যায্য-যুক্তিসংগত ও নীতি
অনুসারে।[6]

আল্লাহ বলেন: “তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে আচরণ কর।’[7]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
‘তোমাদের মাঝে যে নিজের পরিবারের কাছে ভাল, সেই সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে ভাল।’[8]

‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর।’[9]

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, সমগ্র পৃথিবীটাই সম্পদ; আর পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ হল সৎকর্মপরায়ণা স্ত্রী।[10]

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন,যে ব্যক্তির চরিত্র ও ব্যবহার সবচেয়ে উত্তম ঈমানের দিক দিয়ে সে-ই পরিপূর্ণ মু’মিন; তোমাদের মধ্যে সেই সব লোক উত্তম যারা তাদের স্ত্রীদের জন্য ভালো।[11]

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন,তোমাদের কেউ তার স্ত্রীকে মারতে উদ্যত হয় এবং তাকে গোলাম-বাঁদীর ন্যায় মারে; দিনের শেষে সে আবার তার সাথে শোয় (সে কত অকৃতজ্ঞ)।[12]

মু’আবিয়া ইবনে হাইদাহ(রা) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন,আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল!
আমাদের কোন ব্যক্তির উপর তাঁর স্ত্রীর কি অধিকার
রয়েছে?
• তুমি যখন আহার কর তাকেও আহার করাও
• তুমি যখন পরিধান কর তাকেও পরিধান করাও
• কখনও মুখমন্ডলে প্রহার করো না
• কখনও অশ্লীন ভাষায় গালি দিও না
• ঘরের মধ্যে ছাড়া তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।[13]

এ হাদিসগুলো উল্লেখ করতে তো আপনাদের দেখি না!
ভারসাম্য বজায় রেখে নিরপেক্ষতার সহিত সমালোচনা করুন।

সত্য এসেছে মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

তথ্যসূত্রঃ

[1] Srimad Bhagavatam 6.18.33-34

[2] সূরা নিসা ৪/৩৪

[3] সূরা আল বাক্বারাহ ২/৩৪

[4] ইবনে কাসীর ২/৩৪

[5] তিরমিযী শরিফ

[6] বাকারা ২/২২৭

[7] নিসা ৪/১৮

[8] ইবনে মাজাহ :১৯৬৭

[9] মায়েদা : ২

[10] সহীহ মুসলিম

[11] তিরমিযী

[12] সহীহ বুখারী, মুসলিম

[13] আবু দাউদ

[14] সূরা আল ইমরান:137

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s