Gallery

যাকাত: গুরুত্ব ও বিধান

rokimg_20150418_75372
ঈমান ও সালাতের পরে যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। অনেক ইবাদতই কুরআন কারীমে মাত্র ২/৪ বার উল্লেখিত হয়েছে, যেমন রোযা, হজ্জ ইত্যাদি। আবার কিছু ইবাদত অনেক বেশী বার উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে একবার বললেই ফরয হয়ে যায়। বারবার বলার অর্থ গুরুত্ব বুঝানো। সালাতের পরে সবচেয়ে বেশী যাকাতের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা সাধারণত দীনের সবচেয়ে বড় কাজ বুঝাতে বলি “নামায-রোযা”, কিন্তু কুরআনে কোথাও “নামায-রোযা” বলা হয় নি, সব সময় বলা হয়েছে “নামায-যাকাত”। রোযা হলো যাকাতের পরে। যাকাত না দেওয়া কাফিরদের বৈশিষ্ট্য ও জাহান্নামের শাস্তির অন্যতম কারণ। আল্লাহ বলেন:
وَيْلٌ لِلْمُشْرِكِيْنَ الَّذِيْنَ لا يُؤْتُوْنَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُوْنَ
“ধ্বংস মুশরিকদের জন্য, যারা যাকাত প্রদান করে না, আর যারা আখেরাতে অবিশ্বাস করে।” সূরা ফুসসিলাত (৪১): আয়াত ৬-৭।
কুরআনে বলা হয়েছে, জাহান্নামীগণকে প্রশ্ন করা হবে: কিজন্য তোমরা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করছ? তারা তাদের কুফুরীর উল্লেখের সাথে সাথে নামায ও যাকাত ত্যাগের কথা বলবে। তারা বলবে:
لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّيْنَ وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِيْنَ
“আমরা সালাত পালনকারীগণের মধ্যে ছিলাম না। আর আমরা দরিদ্রগণকে খাওয়াতাম না।” সূরা আল- মুদ্দাসসির (৭৪): আয়াত: ৪২-৪৩।
আমরা মনে করি, বৈধ-অবৈধভাবে মাল বৃদ্ধি করলে এবং সঞ্চয় করলেই সম্পদশালী হলাম। কিন্তু আল্লাহ বলেন উল্টো কথা। ব্যয় করলেই আল্লাহ বৃদ্ধি করেন। আপনি দুয়ে দুয়ে চার গুণেছেন। কিন্তু কার জন্য গুণলেন? আপনার জন্য না সন্তানদের জন্য? আল্লাহ বরকত নষ্ট করে দিলে কিছুই থাকবে না। কিভাবে বরকত নষ্ট হবে তা আপনি বুঝতেও পারবেন না। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আল্লাহ বলেন:
يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِيْ الصَّدَقَات
“আল্লাহ সুদের বৃদ্ধিকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করেন আর ‘সাদাকাহ’ বা যাকাতকে বৃদ্ধি করেন।” সূরা বাকারা: ২৭৬ আয়াত।
وَمَا آتَيْتُمْ مِن رِّبًا لِيَرْبُوَ فِيْ أَمْوَالِ النَّاسِ فَلاَ يَرْبُوْ عِنْدَ اللهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيْدُنَ وَجْهَ اللهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ
“এবং তোমরা মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য যে বৃদ্ধি (সুদ) প্রদান কর তা আল্লাহর নিকট বৃদ্ধি পায় না। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তোমরা যে যাকাত প্রদান কর সেই যাকাতই হল বহুগুণ বৃদ্ধিকারী।” সূরা রূম: ৩৯ আয়াত।
আরো কয়েকটি সহীহ হাদীস:
ثَلاثٌ مَنْ فَعَلَهُنَّ فَقَدْ طَعِمَ طَعْمَ الإِيمَانِ مَنْ عَبَدَ اللَّهَ وَحْدَهُ وَ(عَلِمَ) أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَعْطَى زَكَاةَ مَالِهِ طَيِّبَةً بِهَا نَفْسُهُ
“যে ব্যক্তি তিনটি কাজ করবে সে ঈমানের স্বাদ ও মজা লাভ করবে: যে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, জানবে যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আনন্দিত চিত্তে পবিত্র মনে তার সম্পদের যাকাত প্রদান করবে।” আবু দাউদ, আস-সুনান ২/১০৩; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৮৩
ثَلاثٌ أَحْلِفُ عَلَيْهِنَّ لا يَجْعَلُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مَنْ لَهُ سَهْمٌ فِي الإِسْلامِ كَمَنْ لا سَهْمَ لَهُ فَأَسْهُمُ الإِسْلامِ ثَلاثَةٌ الصَّلاةُ وَالصَّوْمُ وَالزَّكَاة
“তিনটি বিষয় আমি শপথ করে বলছি: যে ব্যক্তির ইসলামে অংশ আছে আর যার ইসলামে কোন অংশ নেই দুইজনকে আল্লাহ কখনোই সমান করবেন না। ইসলামের অংশ তিনটি: সালাত, সিয়াম ও যাকাত।” হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৬৭; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৩৭; আলবানী সহীহুত তারগীব ১/৮৯, ১৮১। হাদীসটি সহীহ।
مَنْ أَدَّى زَكَاةً مَالِهِ فَقَدْ ذَهَبَ عَنْهُ شَرُّهُ
“যে তার সম্পদের যাকাত প্রদান করে, তার সম্পদের অকল্যাণ ও অমঙ্গল দূর হয়ে যায়।” হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/৬৩; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৮২। হাদীসটি হাসান।
প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে তাদের একজন হলো যাকাত প্রদান থেকে বিরত সম্পদশালী মুসলিম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وَأَمّا أَوَّلُ ثَلاَثَةٍ يَدْخُلُوْنَ النَّارَ فَأَمِيْرٌ مُسَلِّطٌ وَذُوْ ثَرْوَةٍ مِنْ مَالٍ لاَ يُؤَدِّيْ حَقَّ اللهِ فِيْ مَالِهِ وَفَقِيْرٌ فَجُوْرٌ
“প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে তারা হলো: সেচ্ছাচারী শাসক বা প্রশাসক, সম্পদশালী ব্যক্তি যে তার সম্পদে আল্লাহর যে অধিকার (যাকাত) তা প্রদান করে না এবং পাপাচারে লিপ্ত দরিদ্র ব্যক্তি।” ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১০/৫১৩; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৫৪৪; আলবানী, সহীহুত তারগীব ২/৬৬। হাদীসটি সহীহ।
যাকাত প্রদান থেকে যে মুসলিম বিরত থাকে বা যাকাত দিতে টালবাহনা ও দ্বিধা করে তাকে হাদীসে অভিশপ্ত বা মাল‘ঊন বলা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) বলেন:
آكِلُ الرِّبَا وَمُوكِلُهُ وَكَاتِبُهُ وَشَاهِدَاهُ إِذَا عَلِمُوا بِهِ وَالْوَاشِمَةُ وَالْمُسْتَوْشِمَةُ لِلْحُسْنِ وَلاوِي الصَّدَقَةِ وَالْمُرْتَدُّ أَعْرَابِيًّا بَعْدَ هِجْرَتِهِ مَلْعُونُونَ عَلَى لِسَانِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক, সুদের সাক্ষীদ্বয়- যদি তা জেনেশুনে করে, সৌন্দর্যের জন্য যে নারী নিজের দেহে উল্কিকাটে বা অন্যের দেহে উল্কি কেটে দেয়, যাকাত প্রদানে যে ব্যক্তি টালবাহনা করে বা বিরত থাকে এবং হিজরত করার পরে আবার যে ব্যক্তি বেদুঈন (যাযাবর) জীবনে ফিরে যায় তারা সকলেই কিয়ামতের দিন মুহাম্মাদু -এর জবানীতে অভিশপ্ত মাল‘ঊন।” আহমদ, আল-মুসনাদ ১/৪০৯, ৪৩০, ৪৬৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৫৪৫; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৮৫। হাদীসটি হাসান।
যারা যাকাত না দিয়ে সম্পদ জমা করে রাখে তাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَلاَ يَحْسَبَنَّ الذِّيْنَ يَبْخَلُوْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْراً لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوْا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“আল্লাহ অনুগ্রহ করে যে সম্পদ দান করেছেন সেই সম্পদ নিয়ে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন কখনই মনে না করে যে, তাদের এই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণবহ বা উপকারী, বরং তা তাদের জন্য ক্ষতিকর। তাদের কৃপণতা করে সঞ্চিত সম্পদ কিয়মতের দিন তাদের গলার বেড়ী হবে।” সূরা আল ইমরান (৩): আয়াত ১৮০।
হাদীসের আলোকে জানা যায় যে, কিছু কঠিন পাপ আছে যেগুলির শাস্তি শুধু আখেরাতেই নয়, দুনিয়াতেও ভোগ করতে হয়। বিশেষত যে পাপগুলি মানুষের অধিকারের সাথে জাড়িত এবং যে পাপের ফলে অন্য মানুষ কষ্ট পায় বা সমাজের ক্ষতি হয়। এরূপ পাপ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তবে আল্লাহ সে সমাজে গযব দেন এবং সমাজের সকলেই সে শাস্তি ভোগ কনে। যাকাত প্রদানে টালবাহানা সেসকল পাপের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন:
لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلافِهِمِ الَّذِينَ مَضَوْا وَلَمْ يَنْقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِلا أُخِذُوا بِالسِّنِينَ وَشِدَّةِ الْمَئُونَةِ وَجَوْرِ السُّلْطَانِ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يَمْنَعُوا زَكَاةَ أَمْوَالِهِمْ إِلا مُنِعُوا الْقَطْرَ مِنَ السَّمَاءِ وَلَوْلا الْبَهَائِمُ لَمْ يُمْطَرُوا وَلَمْ يَنْقُضُوا عَهْدَ اللَّهِ وَعَهْدَ رَسُولِهِ إِلا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِنْ غَيْرِهِمْ فَأَخَذُوا بَعْضَ مَا فِي أَيْدِيهِمْ وَمَا لَمْ تَحْكُمْ أَئِمَّتُهُمْ بِكِتَابِ اللَّهِ وَيَتَخَيَّرُوا مِمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلا جَعَلَ اللَّهُ بَأْسَهُمْ بَيْنَهُمْ.
“(১) যখন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পুর্বপুরুষদের মধ্যে প্রসারিত ছিল না। (২) যখন কোন সম্প্রদায়ের মানুষেরা ওজনে কম বা ভেজাল দিতে থাকে, তখন তারা দুর্ভিক্ষ, জীবনযাত্রার কাঠিন্য ও প্রশাসনের বা ক্ষমতাশীলদের অত্যাচারের শিকার হয়। (৩) যদি কোন সম্প্রদায়ের মানুষেরা যাকাত প্রদান না করে, তাহলে তারা অনাবৃষ্টির শিকার হয়। যদি পশুপাখি না থাকতো তাহলে তারা বৃষ্টি থেকে একেবারেই বঞ্চিত হতো। (৪) যখন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের ওয়াদা বা আল্লাহর নামে প্রদত্ত ওয়াদা ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের কোন বিজাতীয় শত্র“কে তাদের উপর ক্ষমতাবান করে দেন, যারা তাদের কিছু সম্পদ নিয়ে যায়। (৫) আর যদি কোন সম্প্রদায়ের শাসকবর্গ ও নেতাগণ আল্লাহর কিতাব (পবিত্র কুরআন) অনুযায়ী বিচার শাসন না করেন এবং আল্লাহর বিধানের সঠিক ও ন্যায়ানুগ প্রয়োগের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা না করে, তখন আল্লাহ তাদের মধ্যে পরস্পর শত্র“তা ও মতবিরোধ সৃষ্টি করে দেন, তারা তাদের বীরত্ব একে অপরকে দেখাতে থাকে।” ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১৩৩২; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৫/৩১৮; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৮৭। হাদীসটি সহীহ।
মূলত পাঁচ প্রকার সম্পদের যাকাত প্রদান করা ফরয। (১) বিচরণশীল উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি গৃহপালিত পশু, (২) সোনা-রূপা, (৩) নগদ টাকা, (৪) ব্যবসা বা বিক্রয়ের জন্য রক্ষিত দ্রব্য ও (৫) কৃষি উৎপাদন বা ফল ও ফসল। যেহেতু আমাদের দেশে খোলা চারণভুমিতে পশু পালনের ব্যবস্থা নেই এবং নিসাবযোগ্য পশুও কারো থাকে না, সেহেতু আমাদের দেশে গৃহপালিত পশুর যাকাত সাধারণভাবে কাউকে দিতে হয় না। এছাড়া বাকি সম্পদগুলির যাকাত প্রদানের নিয়ম নিম্নরূপ:
(১) স্বর্ণ: যদি কারো নিকট সাড়ে ৭ তোলা (ভরি) বা তার বেশি স্বর্ণ থাকে তবে প্রতি চান্দ্র বৎসর (৩৫৪ দিন) পূর্তিতে মোট স্বর্ণের ২.৫% যাকাত প্রদান করতে হবে। যেমন কারো যদি ১০ ভরি স্বর্ণ থাকে তবে প্রতি বৎসরে তাকে ০.২৫ ভরি স্বর্ণ বা তার দাম যাকাত হিসাবে প্রদান করতে হবে। সাড়ে ৭ ভরির কম স্বর্ণ থাকলে যাকাত ফরয হবে না।
(২) রৌপ্য: যদি কারো কাছে সাড়ে ৫২ তোলা বা তার বেশি রূপা থাকে তবে প্রতি চান্দ্র বৎসরে মোট রূপার ২.৫% যাকাত প্রদান করতে হবে।
(৩) নগদ টাকা। নগদ টাকার নিসাব হবে স্বর্ণ বা রৌপ্যের নিসাবে। হাদীসে মূলত রৌপ্যের নিসাবই বলা হয়েছে। এছাড়া রূপার নিসাবে আগে যাকাত ফরয হয়। এজন্য বর্তমানে কারো কাছে যদি সাড়ে ৫২ তোলা রূপার দাম (২০০৮ সালের বাজার মূল্য অনুসারে: ২৪/২৫ হাজার টাকা) এক বৎসর সঞ্চিত থাকে তবে তাকে মোট টাকার ২.৫% যাকাত দিতে হবে। যেমন কারো যদি ৩০ হাজার টাকা সঞ্চিত থাকে তবে তাকে বছর শেষে ৬৫০ টাকা যাকাত দিতে হবে।
(৪) ব্যবসায়ের সম্পদ। বিক্রয়ের জন্য রক্ষিত সকল সম্পদের যাকাত দিতে হবে। যদি দোকানে, গোডাউনে, বাড়িতে মাঠে বা যে কোনো স্থানে বিক্রয়ের জন্য রক্ষিত মাটি, বালি, ইট, গাড়ী, জমি, বাড়ি, ফ্লাট বা অন্য যে কোনো পণ্য থাকে এবং তার মূল্য সাড়ে ৫২ তোলা রূপার মূল্যের সমান বা তার চেয়ে বেশি হয় তবে বৎসর শেষে মোট সম্পদের মূল্যের ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
(৫) ভূমিজাত ফল ও ফসল। ফল-ফসলের যাকাতকে “উশর” বলা হয়। ভুমি ব্যবহার করে উৎপাদিত সকল প্রকারের ফল, ফসল, মধু, লবন ইত্যাদির যাকাত দিতে হবে। ফল-ফসলের যাকাত দিতে হয় প্রতি মৌসূমে ফল-ফসল ঘরে উঠালে। হাদীস শরীফে ফল ফসলের নিসাব বলা হয়েছে ৫ ওয়াসাক। অর্থাৎ প্রায় ২৫ মণ। তবে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেছেন যে, কম বেশি সব ফল-ফসলেরই যাকাত দেওয়া দরকার। ফল-ফসলের যাকাতের পরিমাণ হলে ৫% বা ১০%। বৃষ্টির পানিতে বা স্বাভাবিক মাটির রসে যে সকল ফসল বা ফল হয় তা থেকে ১০% যাকাত দিতে হবে। আর সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত ফল-ফসলের ৫% যাকাত দিতে হবে। ফল বা ফসলের মূল্যও প্রদান করা যায়।
টাকা-পয়সার যাকাত অনেকে প্রদান করেন, কিন্তু ফল-ফসলের যাকাত আমরা প্রদান করি না। ফল-ফসলের যাকাত যে ফরয এ কথাটিই অনেক দীনদার মুসলমান জানেন না। কেউ চিন্তা করেন, এত উৎপাদন ব্যয়, ট্যাক্স, খাজনা ইত্যাদি দেওয়ার পরে আর কিভাবে যাকাত দেব? এরূপ চিন্তা করলে তো আর ব্যবসায়ের যাকাতও দেওয়া লাগে না। সরকারের ট্যাক্স, ভ্যাট, দোকানের ভাড়া, সন্ত্রাসীদের চাঁদা ইত্যাদির কারণে কি আল্লাহর ফরয যাকাত মাফ হয়? কেউ মনে করেন, ইসলামী রাষ্ট্র নয়, কাজেই ফসলের যাকাত লাগবে না। আমাদের দেশ ইসলামী রাষ্ট্র কি না তা অন্য প্রশ্ন। তবে ইসলামী রাষ্ট্র না হলেই যদি ফসরের যাকাত হয় তাহলে টাকাপয়সার যাকাতও মাফ হওয়া দরকার। নামাযও মাফ হওয়া দরকার।
হানাফী ফকহীহণ বলেছেন যে, অনৈসলামিক দেশের জমি, যে জমি উশরীও নয় খারাজীও নয়, সে জমির উৎপাদনের উশর বা যাকাত দেওয়া ফরয। ইসলামী রাষ্ট্রে খারাজী জমির শরীয়ত নির্ধারিত খারাজ দিলে যাকাত মাফ হতে পারে। খারাজ হলো উশরের দ্বিগুণ রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স, মূলত যাকাতের পরিবর্তে কাফিরদের জমি থেকে ইসলামী রাষ্ট্র তা গ্রহণ করে। কিন্তু যে দেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয় তথাকার কোনো জমি খারাজী হতে পারে না এবং এরূপ দেশের জমির উৎপাদনের উশর বা যাকাত মুসলিমকে দিতেই হবে। ইবনু আবেদীন, হাশিয়াতু রাদ্দিল মুহতার ২/৩২৫।
আল্লাহ যে ইবাদত ফরয করেছেন, কোনোভাবে কোনো ছাড় দেওয়ার কথা বলেন নি, আমরা মুমিন হয়ে কিভাবে তা এরূপ এরূপ উদ্ভট যুক্তি বা কোনো আলিমের অপ্রাসঙ্গিক লেখার “দলিল” দিয়ে তা বন্দ করে দেব? এভাবে তো বাংলাদেশে জুমার নামায বন্ধ করা যায়! উপরে যাকাত প্রদান না করার ভয়ঙ্কর পরিণতি জেনেছি। ফসলের যাকাতের ক্ষেত্রেও তা একইভাবে প্রযোজ্য। কুরআন ও হাদীসে বারংবার ফলফসলের যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنْ الأَرْضِ
“হে মুমীনগণ, তোমরা তোমাদের পবিত্র উপার্জন থেকে খরচ কর (যাকাত প্রদান কর) এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা বের করেছি তা থেকে (যাকাত প্রদান কর)।” সূরা বাকারাহ: আয়াত ২৬৭।
অন্য এক আয়াতে এরশাদ করা হয়েছে:
وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
এবং ফল-ফসল কর্তনের দিনে তার পাওনা (দরিদ্রগণের অধিকার বা যাকাত) পরিশোধ কর।” সূরা আন‘আম, আয়াত ১৪১।
অগণিত হাদীসে বারংবার ফল-ফসলের যাকাত প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে বা হাদীসে কোথাও কোনোভাবে বলা হয় নি যে, মুমিনের কোনো জমির ফল বা ফসলের যাকাত দিতে হবে না। তবে যদি তিনটি শর্ত পূরণ হলে হানাফী মাযহাবে উশর বা ফসলের যাকাত না দিলেও চলে: (১) জমিটি ইসলামী পদ্ধতিতে খারাজী ভূমি বলে নির্ধারিত হতে হবে, (২) খারাজের পরিমাণ ইসলামী পদ্ধতিতে নির্ধারিত হতে হবে এবং (৩) কোন ইসলামী রাষ্ট্র সেই নির্ধারিত খারাজ গ্রহণ করে ইসলামী ব্যবস্থায় ব্যয় করবে। এ তিনটি শর্ত আমাদের দেশের কোথাও পাওয়া যায় না।
বিষয়টি বুঝতে হলে উশর ও খারাজের পার্থক্য বুঝা দরকার। কাফিরদের জমি থেকে যে কর নেওয়া হতো তাকে খারাজ বলে। খারাজ উশরের দ্বিগুণ বা আরো বেশি হয়। মুসলিম বিজয়ের সময় যে জমি মুসলিম সৈন্যরা দখল করে কাফির নাগরিকদের প্রদান করে তাকে খারাজী জমি বলে। আর মুসলিম বিজয়ের সময় যে জমি মুসলমানদের হাতে ছিল, বা পতিত ছিল, বা কাফিররা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, পরে মুসলিমরা আবাদ করেছেন অথবা সরকারীভাবে দখল নিয়েছেন বা ক্রয় করেছেন এরূপ সকল জমি ওশরী জমি। কোনো সরকার যদি এরূপ ওশরী জমি থেকে খারাজ গ্রহণ করেন তবে তারপরও মুসলিমের উপর সে জমির ফল-ফসলের যাকাত দেওয়া ফরয। হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুসারে আমাদের দেশের অধিকাংশ জমি উশরী জমি। আর যা কিছু খারাজী জমি আছে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আর কোনো জমি থেকেই ইসলামী নিয়মে খারাজ নেওয়া হয় না। আমরা যে খাজনা, ট্যাক্স ইত্যাদি প্রদান করি তা কখনোই ইসলামী খারাজ নয়। এগুলিকে খারাজ মনে করে যাকাত না দেওয়া আর ইনমাক ট্যাক্স দেওয়ার কারণে যাকাত না দেওয়া একই কথা। আল্লাহর গযব থেকে বাঁচতে প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব নিজের ফল ও ফসলের যাকাত আদায় কর।
সকল প্রকার যাকাত মূলত দরিদ্রদের পাওনা। আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيْلِ فَرِيْضَةً مِنَ اللهِ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَكِيْمٌ
“নিশ্চয় সাদাকাহ (যাকাত) শুধুমাত্র অভাবীদের জন্য, সম্বলহীনদের জন্য, যারা এ খাতে কর্ম করে তাদের জন্য, যাদের অন্তর আকর্ষিত করতে হবে তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের জন্য। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারণ। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী মহাপ্রজ্ঞাময়।” সূরা তাওবাহ, আয়াত ৬০।
ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্য বিমোচন করা। যাকাতের মাধ্যমে দুভাবে দরিদ্রদেরকে সাহায্য করতে হবে। প্রথমত তাদের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানো এবং দ্বিতীয়ত তাদের দারিদ্রের স্থায়ী সমাধান করা। এজন্য ইসলামে যাকাতকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রদান করা হয়েছে। ইসলামের নির্দেশ হলো রাষ্ট্র নাগরিকদের নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ করবে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তা বণ্টন করবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষ্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিতে মুমিন অবশ্যই নিজের ফরয ইবাদত নিজেই আদায় করবেন। যদিও ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায়ের কারণে দারিদ্র বিমোচনে যাকাত পূর্ণ অবদান রাখতে পারছে না। কারণ দরিদ্র ব্যক্তি নগদ টাকা খরচ করে ফেলেন এবং তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন না। এতদসত্ত্বেও আমাদের চেষ্টা করতে হবে ব্যক্তিগতভাবে বা কয়েকজন মিলে একত্রিতভাবে প্রতি বৎসর যাকাতের কিছু টাকা দারিদ্য বিমোচনে ব্যয় করার। যাকাতের টাকা দিয়ে দরিদ্রদেরকে রিকশা, গরু, সেলাই মেশিন বা কুটিরশিল্প জাতীয় কিছু কিনে দেওয়া যায়। যেন গ্রহিতা এগুলি বিক্রয় না করতে পারে সেজন্য তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
যাকাতের সম্পদ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান মূলনীতি হলো তা ব্যক্তিকে প্রদান করতে হবে এবং প্রদান নি:শর্ত হবে। যাকাত গ্রহণকারী ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ স্বত্ব, মালিকানা ও ব্যয়ের ক্ষমতা দিয়ে তা প্রদান করতে হবে। এজন্য যাকাতের অর্থ কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে, মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি কাজে ব্যয় করা যাবে না। অনুরূপভাবে মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন বা ঋণ পরিশোধের জন্যও ব্যয় করা যাবে না। কারণ এখানে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে যাকাত সম্পদের মালিকানা প্রদান করা হচ্ছে না। কোনো নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যদি সঠিক খাতে ব্যয় করার জন্য যাকাত সংগ্রহ করে তাহলে তাদেরকে যাকাত প্রদান করা যাবে। উক্ত প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা যাকাত প্রদানকারী মুসলিমের পক্ষ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এটর্নি হিসাবে বিবেচিত হবেন। তাদের দায়িত্ব হলো সংগৃহীত যাকাত সঠিক খাতের মুসলিমগণকে সঠিকভাবে প্রদান বা বণ্টন করা।
যাকাত গ্রহণকারী ব্যক্তি অবশ্যই মুসলিম হবেন। যাকাত শুধুমাত্র মুসলিমদের প্রাপ্য। কোন অমুসলিম যাকাত পাবেন না। মুসলিম নামধারী কোনো ব্যক্তি যদি নামাজ না পড়ে বা প্রকাশ্য শিরক বা কুফরীতে লিপ্ত থাকে তাহলে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। একজন মুসলিম কোনো অমুসলিমকে নফল দান, সাহায্য ও সামাজিক সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু তার ফরয দান বা যাকাত তিনি শুধুমাত্র মুসলিমকেই প্রদান করবেন। নিজের পিতামাতা, স্ত্রী ও সন্তানগণকে যাকাত দেওয়া যায় না। এছাড়া ভাই বোন, চাচা, মামা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজন কেউ দরিদ্র হলে তাকে যাকাত দেওয়া যায়। বরং তাদেরকে সবচেয়ে আগে বিবেচনা করতে হবে।
যাকাত এবং সকল দানের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হলো এর উপকার যত ব্যাপক হবে সাওয়াবও তত বেশি হবে। যেমন, যে কোনো মুসলিম দরিদ্রকে যাকাত প্রদান করা যাবে। তবে একজন দরিদ্র তালেবে এলেম বা আলেমকে যাকাত প্রদান করলে এ সাহায্য তাকে অধিকতর ইলম চর্চা ও প্রসারের সুযোগ দেবে, যা উক্ত যাকাত দ্বারা অর্জিত অতিরিক্ত উপকার। এজন্য যাকাত দাতার সাওয়াব বৃদ্ধি পাবে। যাকাত ও উশর প্রদানের সময় এ মূলনীতির দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার, যেন আমাদের যাকাত শুধুই ব্যক্তিগত আর্থিক সাহায্য না হয়ে অধিকতর কিছু কল্যাণে পরোক্ষভাবে হলেও অবদান রাখে। কোনো ভাল মাদ্রাসায় যদি যাকত তহবিল থাকে তাহলে আপনাদের যাকাত ও উশরের টাকা বা ফসল সেখানে দেবেন। এতে যাকাত আদায় ছাড়াও ইলম প্রচারের অতিরিক্ত সাওয়াব হবে। অনুরূপভাবে দীনদার দরিদ্র মানুষকে দিলে যাকাত আদায় ছাড়াও দীন পালনে সহযোগিত হবে।
আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক প্রদান করুন। আমীন।
ভাল লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s