Gallery

রাসুল (সাঃ) রমজান মাসে বিশ রাকা’আত তারাবীহ আদায় করেছেন’ এই মর্মে বিশুদ্ধ কোন বর্ণনা আছে কি?

রাসুল (সাঃ) রমজান মাসে বিশ রাকা’আত তারাবীহর সলাত আদায় করেছেন’ এই মর্মে বিশুদ্ধ কোন বর্ণনা নেইঃ
ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ”রাসুল (সঃ) রমাদান মাসে ২০ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন এবং বিতর পড়তেন” মুহাদ্দিসগনের দৃষ্টিতে রাসুল (সঃ) এর নামে প্রচলিত ২০ রাকা’আত তারাবীহ হাদীসটি জাল।
”তিনি রমাদান মাসে জামা’আত ছাড়াই বিশ রাকা’আত এবং বিতরের সলাত পড়তেন” ২০ রাকা’আত তারাবীহ সম্পর্কে যতগুলো বর্ণনা পাওয়া যায় তন্মধ্যে মাত্র একটি বর্ণনা রাসুল (সঃ) এর নামে বানানো হয়েছে, যা রিজালশাস্ত্রবিদগণের মতে যইফ ও জাল।
হাদীসটির দোষ হলঃ এতে রয়েছে আবু শায়বাহ ইবরাহীম বিন উসমান। তার সম্পর্কে ইবন হাজার ‘’তাকরীব’’ গ্রন্থে বলেছেন- তার হাদিস পরিত্যাজ্য। বর্ণনাটির একটিই মাত্র সুত্র, যা কয়েকটি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসটি ইবন আবী শায়বাহ ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন (২/৯০/২), আবদ বিন হুমাইদ ‘আল-মুন্তাখাব মিনাল মুসনাদ’ (৭৩/১-২) গ্রন্থে, তাবারানি ‘আল-মুজামুল কাবীর’ (৩/১৪৮/২) গ্রন্থে এবং ‘আল-আওসাত’ গ্রন্থে, যেমনটি ইমাম যাহাবীর ‘আল-মুনতাকা’ (৩/২) গ্রন্থে ও ‘যাওায়েদুল মু’জামায়িন’ (১/১০৯/১) গ্রন্থে, ইবন আদী ‘আল-কামিল’ (১/২) গ্রন্থে, আল-খাতীব ‘আল-মুওয়াযিযহ’ (১/২০৯) গ্রন্থে, আবুল হাসান আন-না’আলী তার ‘হাদীস’ (১/১২৭) গ্রন্থে, আবু আমর ইবন মান্দাহ ‘আল-মুন্তাখাব মিনাল ফাওয়ায়েদ’ (২/২৬৮) গ্রন্থে, এবং বাইহাকি তাঁর ‘আস-সুনানুল কুবরা’ (২/৪৯৬) গ্রন্থে (তাঁরা সবাই)আবু শায়বাহ ইবরাহীম বিন উসমান সুত্রেআল-হাকিম হতে তিনি মুকসিম হতে তিনি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
আবু শায়বাহ ইবরাহীম ইবন উসমান মুহাদ্দিসগনের ঐকমতে যইফ। অনেক মুহাদ্দিস তাকে মিথ্যুক বলেছেন। অত্র হাদীসের রাবী আবু শায়বাহ ইবরাহীম বিন উসমান সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মন্তব্যঃ
১) তাবারানি বলেছেনঃ আবু শায়বাহ ইবরাহীম বিন উসমান এককভাবে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি যইফ (দুর্বল)।
২) বাইহাকি (আস-সুনানুল কুবরা ৪৬১৫) বলেনঃ আবু শায়বাহ ইবরাহীম বিন উসমান যইফ (দুর্বল)
৩) হাইসামী ‘আল-মাজমা’ গ্রন্থের (৩/১৭২)-তে বলেছেনঃ তিনি যইফ (দুর্বল)।
৪) ইবন হাযার ‘ফাতহুল বারী’ (৪/২০৫) গ্রন্থে বলেনঃ এটির সনদ যইফ (দুর্বল)।
৫) ইবন মাঈন বলেছেনঃ সে নির্ভরযোগ্য নয়। মিযানুল ই’তিদাল, পৃষ্ঠা নঃ ১৪৭
৬) জাওযানী বলেছেনঃ সে পরিত্যাজ্য ব্যক্তি।
৭) ইমাম শু’বাহ তাকে মিথ্যুক বলেছেন। ইমাম শু’বাহ আরও বলেছেন, তার থেকে হাদীস বর্ণনা করা যাবে না। কারন সে নিন্দিত।
৮) ইমাম মুযানী তার বর্ণিত হাদীস সমুহকে মুনকার বলেছেন।
৯) সালেহ ইবন মুহাম্মাদ আল বাগদাদী বলেনঃ তিনি দুর্বল। তার বর্ণিত হাদীস লিখে রাখার যোগ্য নয়।
১০) আবু আলী নিশাপুরী বলেনঃ তিনি দুর্বল।
১১) ইমাম আহমাদ তাকে যইফ বলেছেন। মিযানুল ই’তিদাল, পৃষ্ঠা নঃ ১৪৭
১২) ইমাম নাসাঈ তাকে যইফ বলেছেন। অন্যত্র তাকে ‘হাদীসের পরিত্যেক্ত রাবী’ বলেছেন।
১৩) ইমাম মিযযি তাকে মুনকার বলেছেন। মিযানুল ই’তিদাল, পৃষ্ঠা নঃ ১৪৭
১৪) আবু হাতিম হাদীসটিকে যইফ বলেছেন।
১৫) ইবন আদী যইফ বলেছেন।
১৬) আবু দাউদ যইফ বলেছেন।
১৭) তিরমিযি তাকে মুনকার হাদীসের বর্ণনাকারী বলেছেন।
১৮) যাহাবী তার মুনকার হাদিসের মধ্যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। যাহাবী আরো বলেছেনঃ শু’বাহর মতো যারা তাঁকে মিথ্যাবাদী মনে করেন তারা তার হাদীসের দিকে ভ্রুক্ষেপ করেন না।
১৯) ইবন হাজার আসকালানী উক্ত রাবী সম্পর্কে তাকরিবুত তাহযীব গ্রন্থে বলেনঃ সে হাদিসের পরিত্যাক্ত রাবী।
২০) ইবন হাজার হাইসামী ‘ফাতাওয়া কুবরা’ গ্রন্থে (১/১৯৫) হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেছেনঃ তিনি (আবু শায়বাহ ইবরাহীম বিন উসমান) অত্যন্ত দুর্বল।
২১) জালালুদ্দিন সুয়ুতী ‘আল-হাবী লিল ফাতাওয়া’ গ্রন্থে (১/৫৩৭) বলেনঃ হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল। এর দ্বারা কখনো দলীল সাব্যস্ত হবে না।
২২) ইমাম বুখারী বলেছেনঃ তার ব্যপারে মুহাদ্দিসগন নীরবতা পালন করেছেন।
২৩) ইবন কাসীর ‘ইখতিসার উলুমুল হাদিস’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১১৮)-তে উল্লেখ করেছেনঃ ইমাম বুখারী যার ব্যপারে বলবেন ‘তার ব্যপারে নীরবতা পালন করা হয়েছে’ সে ব্যক্তি তার নিকট একদম নিম্নতম ও নিকৃষ্ট ব্যক্তি।
২৫) আলবানী বলেছেনঃ নিশ্চয়ই এ হাদীসটি জাল।
সম্মানিত পাঠক! রাসুল (সঃ) এর নামে বর্ণিত ২০ রাকা’আত তারাবীহর হাদীস সম্পর্কে রিজালশাস্ত্রবিদ ও জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিসগনের যে বক্তব্য পেশ করা হল, আশা করি বিষয়টি সবার কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এটি একটি মিথ্যা, জাল ও বানোয়াট বর্ণনা। যেমন আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী ২০ রাকা’আতের হাদীসকে দলীলের অযোগ্য ঘোষণা করে বলেনঃ ‘’২০ রাকা’আত তারাবীহ রাসুল (সঃ) থেকে প্রমানিত নয়’’। আল-হাবী লিল ফাতাওয়া গ্রন্থে (১/৫৩৬-৫৩৭)
হানাফি বিদ্বানদের বক্তব্য উক্ত হাদিসের সনদ সম্পর্কেঃ
১) হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হিদায়ার ভাষ্যকার ইবনুল হুমাম উক্ত হাদিসটি সম্পর্কে বলেনঃ মুহাদ্দিসগনের ঐকমতে স্বীকৃত যইফ রাবী ইবরাহীম ইবন উসমান থাকার কারনে হাদীসটি যইফ’’ ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর শারহে হিদায়া ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা নঃ ৪০৭
২) হিদায়া কিতাবের হাদীস যাচাইকারী যাইলাঈ উক্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেনঃ ইবরাহীম ইবন উসমানের কারনে হাদীসটি ত্রুটিপূর্ণ। সে সর্বসম্মতিক্রমে যইফ। যাইলাঈ, নাসবুর রায়াহ ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা নঃ ১৫৩
৩) বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থ উমদাতুল কারী প্রনেতা বদরুদ্দীন আইনি উক্ত রাবী সম্পর্কে বলেনঃ ইবন আবী শায়বাকে ইমাম শু’বা মিথ্যুক বলেছেন, এবং ইমাম আহমাদ, ইবন মাঈন, ইমাম বুখারী, ইমাম নাসাঈ সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগন তাকে যইফ বলেছেন। বদরুদ্দীন আইনি, উমদাতুল কারী শারহে সাহীহিল বুখারী ১১/১২৮
৪) মোল্লা আলী কারী বলেনঃ আমাদের কোন কোন ইমামের বক্তব্য হল- রাসুল (সাঃ) লোকদের সাথে নিয়ে ২০ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন। সম্ভবত তিনি মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ থেকে এটি গ্রহন করেছেন যে, তিনি রমজান মাসে বিতর ছাড়াই বিশ রাকা’আত তারাবীহ পড়েছেন। অনুরুপভাবে বায়হাকীও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি দু’ই রাতে দশ সালামে বিশ রাকা’আত তারাবীহ আদায় করেছেন। তৃতীয় রাত্রিতে তিনি আর বের হননি। কিন্তু উক্ত দু’টি বর্ণনাই যইফ। মুহাম্মাদ আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ শারহে মিশকাতুল মাসাবীহ, ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা নঃ ১৯৪
৪) আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি অত্র হাদীসটিকে যইফ বলেছেন।
শেষ কথাঃ সুতরাং প্রমানিত হল যে, ২০ রাকা’আত তারাবীহ রাসুল (সাঃ) থেকে প্রমানিত নয়।
সহায়ক গ্রন্থঃ
যইফ ও জাল হাদীস- আলবানী; ২য় খণ্ড; হাদীস ন; ৫৬০; পৃষ্ঠা নঃ ১০৫
সলাতুত তারাবীহ- আলবানী পৃষ্ঠা নঃ ২৭-২৯
নামযে প্রচলিত ভুল মাসায়েলের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা- আব্দুল হাফিজ পাঠান; পৃষ্ঠা নঃ ৫১৯-৫২৯
তারাবীহর রাকা’আত সংখ্যা- মুযাফফর বিন মুহসিন পৃষ্ঠা নঃ ২৩-২৭

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s