Gallery

ফিকহি ইখতিলাফ রাসুলুল্লাহ ও সাহাবীগনের সময় ছিল, কিন্তু তার বিরোধিতা করা নয় নি, হাদীস দ্বারা প্রমানীত।

ফিকহি ইখতিলাফ রাসুলুল্লাহ ও সাহাবীগনের সময় ছিল, কিন্তু তার বিরোধিতা করা নয় নি, হাদীস দ্বারা প্রমানীত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফেরত আসলেন, তখন জিবরীল আলাইহি ওয়া সালাম এসে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বানু কুরায়যায় অভিযান পরিচালনার প্রতি ইঙ্গিত করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে বললেন, তোমাদের কেউ যেন বানু কুরায়যায় না গিয়ে আসরের সালাত আদায় না করে।[সহীহ বুখারী, কিতাবুল খাওফ; ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম, পৃঃ ৫০]
সাহাবীগণ এ কথা শুনে মদীনা হতে বের হয়ে বানু কুরায়যার দিকে রওনা দিলেন। পথি মধ্যে আসরের সালাতের সময় হয়ে গেল। তাদের(সাহাবীদের একদল) কেউ কেউ নামায না পড়েই বানু কুরায়যায় পৌঁছে গেলেন। এদিকে নামাযের সময় শেষ হয়ে গেল। তারা(এই দলের সাহাবীগণ) বললেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আসরের নামায অবশ্যই বানু কুরায়যায় গিয়ে পড়তে হবে। আর তাদের(সাহাবীদের আরেকদল) কেউ কেউ নামায ঠিক সময়ে(পথের মদ্ধেই) পড়ে নিল। তাদের(এই দলের সাহাবীগনের) কথা হলোঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের তাড়াতাড়ি বের হতে বলেছেন।(রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে বললেন, তোমাদের কেউ যেন বানু কুরায়যায় না গিয়ে আসরের সালাত আদায় না করে। এই কথার উপর ইজতিহাদ করে এই সাহাবীগণ বলছেন) তার কথার অর্থ এটা নয় যে, আমরা সময় মত নামায না পড়ে পিছিয়ে দিব।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’দলের কাউকে কিছুই বলেন নি। আর সাহাবীগনের মধ্যে এই নিয়ে কোনো শত্রুতা পোষণ করেন নি এবং তাদের মধ্যে কোনো প্রকার বিদ্বেষও সৃষ্টি হয় নি। [ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম, পৃঃ ৫০]
অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশঃ “তোমাদের কেউ যেন বানু কুরায়যায় না গিয়ে আসরের সালাত আদায় না করে” কে বুঝার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন, এক দল সাহাবী এই নির্দেশকে সরাসরী অনুসরন করেছেন আর আরেকদল সাহাবী এই নির্দেশের উপর ইজতিহাদ করে পথের মদ্ধেই সালাত আদায় করে নেন, এই দল সাহাবীদের মতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নির্দেশ দিয়েছিলেন তাড়াতাড়ি বের হওয়ার জন্য। শাইখ সালিহ আল উসাইমিন বলেন, এই দল সাহাবী সঠিক ছিলেন।
উপরের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হলো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনেও ফিকহি ইখতিলাফ হয়েছিল, কিন্তু তিনি এই ইখতিলাফকে সরিয়ে দেন নি, এবং কোনো দলকেই সঠিক বা ভুল বলেন নি, সুতরাং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ফিকহি ইখতিলাফ কিছুই নয়, ফিকহি ইখতিলাফের জন্য শত্রুতা পোষণ করা, হিংসা-বিদ্ধেশ বা দলাদলি করা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারীদের কাজ নয়, আমাদের ঐক্য হতে হবে আকীদার মাধ্যমে, আকীদার মধ্যে কোনো ইখতিলাফ মোটেই গ্রহনযোগ্য নয়, আকীদার ক্ষেত্রে ইখতিলাফ করার কারনেই পূর্ববর্তী উম্মাতেরা ধংস হয়েছে, আকীদার ইখতিলাফ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময় ছিল না, সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ীদের মধ্যেও আকীদার ইখতিলাফ ছিল না, তবে তাদের মধ্যে প্রচুর পরিমানে ফিকহি ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু তার পরও তারা ঐক্যতার মধ্যেই ছিলেন।
যেমনঃ
১. সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবন উমার এবং আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুম সালাতে ‘বিসমিল্লাহ’ জোরে পাঠ করতেন, আর অন্যান্যরা আস্তে বা নিরবে পাঠ করতেন।
২. কিছু সাহাবীগণ সর্বদা ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পাঠ করার মত দিতেন আর বাকিরা যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন উমার, জেহরী সালাতে ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পাঠ করতে বারন করতেন, তাবেয়ীদের মধ্যে প্রখ্যাত তাবিয়ী আতা রাহিমাহুল্লাহ ইমামের পিছনে জেহরী সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠ করতে বারন করতেন আর তাবিয়ী হাসান আল-বাসরী রাহিমাহুল্লাহ সর্বদা ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পড়ার মত দিতেন।
৩. সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ সারা জীবন ফজর সালাতে কুনুত পরতেন, আর বাকিরা পরতেন না, কেউ কেউ সারা জীবন বিতর সালাতে কুনুত পরতেন যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আর অপর দিকে আব্দুল্লাহ ইবন উমার কখনই বিতর সালাতে কুনুত পরতেন না আবার আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু শুধু মাত্র রমজানের শেষ অর্ধেক(অথবা শেষ ১০ দিন, আমি একটু ভুলে গেছি) বিতর সালাতে কুনুত আর, এছাড়া আর পরতেন না, উবাই ইবনু কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু রমজানের শেষ ১৫দিন বিতরে কুনুত পরতেন, অন্য সময় পরতেন না।
এরুপ বহু ফিকহি ইখতিলাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে সাহাবীগনের মধ্যে ছিল, তার মৃত্যুর পরও সাহাবীদের মধ্যে ফিকহি ইখতিলাফ ছিল, তাবেয়ীদের মধ্যেও এবং তাবি-তাবিয়ীদের মধ্যেও ছিল, তাহলে আজ প্রায় ১৪০০ বছর পর আমরা কিভাবে বলতে পারি যে, ফিকহি ইখতিলাফ থাকবে না??? এইটি চিন্তার বিষয়,
সমসাময়ীক সৌদি আরবের জনপ্রিয় ৩জন আলীম, শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ বিন বায, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালিহ আল-উসাইমীন, এবং শাইখ নাসীরুদ্দীন আল-আলবানী, রাহিমাহুমুল্লাহ, যারা বর্তমানে ফিকহি ইখতিলাফের বিরোধিতা করেন তাদের কাছে উপরের ৩জন আলিম খুবই সম্মানিত,(আমার কাছেও সম্মানিত) তাদের দাবী অনুসারী উপরের ৩জন কোনো মাজহাব পন্থী নন, বা মাযহাবের গোরামী করেন না বরং কোরআন ও সুন্নাহের উপর আমল কারী, আমার প্রশ্ন তাহলে এই ৩জন আলিমের মধ্যে এতো ফিকহি ইখতিলাহ কেন???
১. শাইখ ইবন বায এর মতে ফজরের আযানে ‘আসসালাতু খইরুম মিনান নাউম’ বলবে না, বরং ফযরের ইকামাতের মধ্যে বলবে, আর শাইখ ইবন উসাইমীনের মতে ফজরের আযানের মধ্যেই বলবে।
২. শাইখ ইবন বায ও ইবন উসাইমীন এর মতে সালাতে সিজদাহ এ যাওয়ার সময় আগে হাটু রাখবে তার পড় হাত, (এটি জমহুর উলামাগনের মত, ইমাম আবু হানিফা, শাফিয়ী, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইবন তায়মিয়্যাহ, ইবন কাসীর, ইবন কায়্যুম সহ আরও অনেকের) আর শাইখ আলবানীর মত হল আগে হাত রাখবে তার পড় হাটু রাখবে(এটি ইমাম মালিকের মত)
৩. শাইখ ইবন বায ও ইবন উসাইমীনের মতে, সর্বদা ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পড়বে, আর শাইখ আলবানীর মতে জেহরী সালাতে ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পাঠ করবে না।
৪. শাইখ ইবন বায ও ইবন উসাইমীন এর মতে নারীদের স্বর্ণ পড়া হালাল কিন্তু শাইখ আলবানীর মতে নারীদের স্বর্ণ পড়া যায়েজ নয় বরং সম্পূর্ণ হারাম।
৫. শাইখ ইবন বায ও আলবানী এর মতে সালাতে জালসা ইস্তেরাহা করবে কিন্তু শাইখ ইবন উসাইমীনের মতে জালসা ইস্তেরাহা করবে না বরং সিজদাহ থেকে সরাসরি উঠে দাঁড়াবে।
এরুপ বহু ইখতিলাফ রয়েছে উপরের ৩জন আলিমের মধ্যে। তারা কোরআন ও সুন্নাহর অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও এতো ফিকহি ইখতিলাফ কেন তাদের মধ্যে? তারা ৩জন কি আপনার আর আমার কাছ থেকে হাদীস কম বুঝতেন? নাকি আমি আর আপনি তাদের কাছ থেকে বেশী জ্ঞানী??? তাদের মধ্যেই যদি ফিকহি ইখতিলাফ তাহলে আপনি কিভাবে দূর করবেন ফিকহি ইখতিলাফ???
সাহাবীদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থাকা সত্ত্বেও সাহাবীদের মধ্যে ফিকহি ইখতিলাফ ছিল, তাহলে আমরা কিভাবে ১৪০০বছর পড়ে শুধু মাত্র কিতাব থেকে হাদীস পড়েই দাবী করি যে, ফিকহি ইখতিলাফ থাকবে না? ফিকহি ইখতিলাফ দূর করা যাবে? এটি চরম মূর্খতার পরিচয় বহন করে। যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস পড়েই ফিকহি ইখতিলাফ দূর করা যেত তাহলে সাহাবীগনের মধ্যে কেন ফিকহি ইখতিলাফ ছিল? সাহাবীদের মধ্যে তো রাসসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত ছিলেন, আর যদি ফিকহি ইখতিলাফ দূর করা প্রয়োজন হত তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ দু’ দল সাহাবীদের ইখতিলাফ দূর করতেন, কিন্তু তিনি ঐ ফিকহি ইখতিলাফ দূর করেন নি, এ থেকেই প্রমান হয় যে, ফিকহি ইখতিলাফ দূর করা আবশ্যকীয় নয়, যারাই এই বিষয়ে আরও জানতে চান তারা, শাইখ ইবন উসাইমীন এর ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম, এর ৪৮ নং পৃ, প্রশ্ন-৬ এর উত্তর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
দুঃখ লাগে তখন যখন, ইমাম আবু হানিফা বা মালিক বা শাফিয়ী বা আহমাদ ইবন হাম্বলের ইজতিহাদের বিপরীতে কোনো হাদীস পেলেই কেউ কেউ বলেন, ‘তিনি হাদীস বুঝতেন না’, ‘তিনি শুধু কিয়াস করতেন’, ‘তিনি কিয়াসের প্রবর্তক’, ‘তার অনুসারীরা ভ্রান্ত’ আরও অনেক কিছু কিন্তু যখন শাইখ আলবানীর ইজতিহাদের বিপরীতে হাদীস পাওয়া যায় তখন তারা বলেন ‘শাইখ হাদিসটি যেমন বুঝেছেন ঠিক তেমন নয়’, ‘সম্ভবত হাদিসটি শাইখ এর নিকট দুর্বল’। ৪ ইমামের সময় এমন ভাষা আর শাইখ আলবানীর সময় মুখে খৈ ফুটে কেন??? ইমাম আবু হানিফা বা মালিক বা শাফিয়ী বা আহমাদ ইবন হাম্বলের সম্মান বেশী নাকি শাইখ আলবানীর? মনে রাখবেন শাইখ আলবানীও উপরের ৪ জন ইমামের নামের পূর্বে “ইমাম বা নেতা” উল্লেখ করতেন, আর শাইখ আলবানীও ৪ ইমামের অনুসরন অস্বীকার করেন নি, তাদের অনুসারীদের নিন্দা করেন নি কেবল মাত্র অন্ধ অনুসারীদের বিরোধিতা করেছেন। সুতরাং কারোও প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন না, সেই ৪জন ইমাম ছিলেন সবচেয়ে বড় পর্যায়ের আলীম, তাদের সম্মান উপরের ৩জন শাইখ থেকে অনেক অনেক বেশী।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s